পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির অলিন্দে এবার চরম নাটকীয় মোড়। বিধানসভার সচিবালয়ের কড়া অবস্থান এবং আইনি নিয়মের বেড়াজালে জড়িয়ে আপাতত আটকে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিরোধী দলনেতা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার প্রক্রিয়া। তবে দমে না গিয়ে এবার বিধানসভার স্পিকারের বেঁধে দেওয়া কঠোর নিয়ম মেনেই পাল্টা চাল চালতে চলেছে রাজ্যের শাসকদল। জানা গিয়েছে, স্পিকারের দফতর থেকে উত্থাপিত দাবি ও শর্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিয়ে এবার নিজেদের দলের সমস্ত বিধায়কদের সশরীরে স্বাক্ষর সম্বলিত একটি নতুন চিঠি বিধানসভার সচিবালয়ে পাঠাতে চলেছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস।
ঘটনার সূত্রপাত অষ্টাদশ বিধানসভা গঠনের পর থেকেই। বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করে তৃণমূলের পক্ষ থেকে গত ১৩ মে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুর উদ্দেশ্যে একটি অফিসিয়াল চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু প্রথম অধিবেশন পার হয়ে গেলেও বিধানসভার সচিবালয় তাঁকে এই সাংবিধানিক পদের মান্যতা দেয়নি। এই চরম উদাসীনতা ও জটিলতা দেখেই ক্ষুব্ধ শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সরাসরি ‘তথ্য জানার অধিকার আইন’ বা আরটিআই (RTI) অ্যাক্টের দ্বারস্থ হন। তিনি স্পষ্ট জানতে চান, ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন নিয়মে বিরোধী দলনেতাদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, আর তাঁর ক্ষেত্রে কেন এমন টালবাহানা করা হচ্ছে?
শোভনদেবের এই আরটিআই-এর পাল্টা জবাব দিয়ে স্পিকারের দফতর এবং বিধানসভার সচিবালয় আইনি অবস্থান স্পষ্ট করেছে। স্পিকারের সচিবালয় থেকে সাফ জানানো হয়েছে, কেবল দলের প্যাডে সাধারণ চিঠি পাঠিয়ে দিলেই বিরোধী দলনেতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয়। নিয়ম অনুযায়ী, তৃণমূল পরিষদীয় দলের যে বিশেষ বৈঠকে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সেই বৈঠকের অফিসিয়াল রেজোলিউশন কপি বা প্রস্তাবটি জমা দিতে হবে। শুধু তাই নয়, সেই প্রস্তাবে দলের অন্তত ৮০ জন বিধায়কের সশরীরে করা স্বাক্ষর সম্বলিত সমর্থনপত্রটি স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
এই আইনি জট কাটানোর জন্য মঙ্গলবার কালীঘাটে মূল দলীয় সাংগঠনিক বৈঠকের ঠিক আগেই তড়িঘড়ি একটি হাইভোল্টেজ পরিষদীয় বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকেই স্পিকারের দাবি মেনে বিধায়কদের স্বাক্ষর সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং একটি নতুন খসড়া চিঠি প্রস্তুত করা হয়। তবে এই বৈঠকেও নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, কারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সাংগঠনিক অধিবেশনে শাসকদলের প্রায় ১৫ জন বিধায়ক অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যার দিক থেকে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার পদটি পেতে তৃণমূলের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বিধানসভার সচিবালয় কেবল একটি বিষয়ই মনে করিয়ে দিচ্ছে— পদ পেতে কোনো রাজনৈতিক দাক্ষিণ্য নয়, বরং সংসদীয় নিয়ম ও আইনি পদ্ধতি মেনেই আবেদন করতে হবে। এখন দেখার, এই নতুন গণ-স্বাক্ষরিত চিঠি জমা পড়ার পর স্পিকারের দফতর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে কবে নাগাদ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।





