সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি আর প্রকৃতির রুদ্ররূপকে খাঁচায় বন্দি করার এক অবিশ্বাস্য ও জাদুকরী রূপকথা। যে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জেয়ারের জলের নিচে চলে যাওয়ার কথা, সেই নেদারল্যান্ডস কীভাবে জলকে জয় করে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে—তা নিজের চোখে দেখতে এবার ঐতিহাসিক ‘অ্যাফশ্লুটডাইক’ (Afsluitdijk) বাঁধে পৌঁছালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ডাচদের এই অবিশ্বাস্য এবং দূরদর্শী জল-ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরি বিদ্যা খতিয়ে দেখে আক্ষরিক অর্থেই চমৎকৃত ভারতের প্রধানমন্ত্রী। ভারতের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকাগুলোকে সুরক্ষিত করতে নেদারল্যান্ডসের এই বিশ্ববিখ্যাত মডেল কীভাবে কাজে লাগানো যায়, মূলত সেই ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতেই মোদির এই হাই-ভোল্টেজ মেগা সফর।
নেদারল্যান্ডসের এই ঐতিহাসিক বাঁধটি কেবল একটি কংক্রিটের দেওয়াল নয়, বরং এটিকে মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারিগরি নিদর্শন বলে মনে করা হয়। প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকাণ্ড বাঁধটি উত্তর সাগরকে একটি বিশাল লবণাক্ত উপসাগর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে মিষ্টি জলের হ্রদে পরিণত করেছে। ১৯৩২ সালে তৈরি হওয়া এই বাঁধের ফলেই নেদারল্যান্ডসের এক বিস্তীর্ণ অংশ বন্যার হাত থেকে চিরতরে রক্ষা পায় এবং সমুদ্রের বুক থেকে উদ্ধার করা জমিতে গড়ে ওঠে নতুন জনপদ।
বাঁধ পরিদর্শনে আপ্লুত মোদি: ডাচ ইঞ্জিনিয়ারিংকে কুর্নিশ
কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন এই সুবিশাল বাঁধের ওপর পৌঁছান, তখন ডাচ সরকারের শীর্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা তাঁকে এই বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ এবং জল ব্যবস্থাপনার নিখুঁত কৌশল বুঝিয়ে বলেন। সমুদ্রের জলস্তর ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কীভাবে এই বাঁধ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশকে সুরক্ষিত রাখছে, তা খুঁটিয়ে দেখেন মোদি। ডাচদের এই হার-না-মানা মানসিকতা এবং অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিকে ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
ভারতের সমুদ্র উপকূল রক্ষায় কি নতুন রূপরেখা?
কূটনৈতিক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোদির এই সফরের পেছনে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। ভারতের প্রায় সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল রয়েছে, যা প্রায়শই আমফান, ইয়াস বা ওখির মতো বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় এবং সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মুখোমুখি হয়। বিশেষ করে সুন্দরবন, ওড়িশা বা গুজরাটের উপকূলবর্তী নিচু এলাকাগুলোকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে ডাচদের এই ‘অ্যাফশ্লুটডাইক’ বাঁধের প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক পরিদর্শনের পর ভারত ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব উপকূল সুরক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন যৌথ অংশীদারিত্বের সূচনা হতে চলেছে। প্রকৃতির শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের এই অবিশ্বাস্য জয়ের সাক্ষী থেকে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন—ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে বিশ্বমানের এই প্রযুক্তিই হতে চলেছে ভারতের আগামী দিনের ঢাল।





