পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী দমনে এক ঐতিহাসিক সাফল্যের সাক্ষী থাকল রাজ্য প্রশাসন। মঙ্গলবার রাজ্য রাজনীতির এপিসেন্টার হয়ে উঠল কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজার। একদিকে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ মাওবাদী নেতা মাধাই পাত্রের আত্মসমর্পণ, অন্যদিকে ঝাড়খণ্ডের ত্রাস হিসেবে পরিচিত মোস্ট ওয়ান্টেড নেত্রী শ্রদ্ধা বিশ্বাস ওরফে বেলার গ্রেফতারি— এই জোড়া সাফল্যকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এক বিশাল প্রশাসনিক জয় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মাওবাদী কার্যকলাপ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছিলেন, এটি তারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
লালবাজারে আত্মসমর্পণ: হিংসার পথ ছাড়লেন মাধাই
মঙ্গলবার সকালে নাটকীয়ভাবে লালবাজারে উপস্থিত হয়ে আত্মসমর্পণ করেন বর্ষীয়ান মাওবাদী নেতা মাধাই পাত্র। হুগলির জঙ্গিপাড়ার বাসিন্দা এই নেতা বহু দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের মাওবাদী আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ সাংবাদিক বৈঠকে জানান, মাধাই পাত্র স্বেচ্ছায় মূলস্রোতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সূত্রের খবর, দীর্ঘদিনের গোপন ডেরা, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা এবং ক্লান্তিবোধ থেকেই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। এদিন মাধাই পাত্র স্পষ্ট ভাষায় জানান, “হিংসার পথ কোনো সমাধান দিতে পারে না।” তিনি তাঁর প্রাক্তন সহযোদ্ধাদেরও অস্ত্র ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
এসটিএফ-এর বড় শিকার: জালে ১৫ লক্ষি মাওবাদী নেত্রী
একই দিনে এক গোপন অপারেশনে কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (STF) উত্তর কাশীপুর এলাকায় হানা দিয়ে পাকড়াও করে কুখ্যাত মাওবাদী নেত্রী শ্রদ্ধা বিশ্বাস ওরফে বেলাকে। ঝাড়খণ্ড সরকারের খাতায় তাঁর মাথার দাম ছিল ১৫ লক্ষ টাকা। একাধিক নাশকতামূলক কাজ, অস্ত্র পাচার এবং মাওবাদী স্কোয়াড পরিচালনার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন রাজ্যের গোয়েন্দারা তাঁর সন্ধানে ছিলেন। গোয়েন্দাদের দাবি, তিনি কোনো বড়সড় নাশকতার ছক কষতেই রাজ্যে গা ঢাকা দিয়েছিলেন।
সাফল্যের নেপথ্যে ‘শুভেন্দু মডেল’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গলমহল এবং সংলগ্ন এলাকায় মাওবাদী ভিত আলগা করতে এই জোড়া সাফল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জঙ্গলমহলের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছিলেন। আত্মসমর্পণ কেবল একজন নেতার বিদায় নয়, বরং সংগঠনের ভেতরে মনোবল ভেঙে দেওয়ার এক কৌশলগত জয়। প্রশাসনের দাবি, দমন-পীড়ন নয় বরং উন্নয়ন এবং নিরাপত্তার সমান্তরাল চলনই এই সাফল্যের চাবিকাঠি।
উন্নয়ন না কি সতর্কতা? চর্চায় জঙ্গলমহল
তবে এই সাফল্য নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। বিরোধীদের দাবি, শুধুমাত্র ধরপাকড় করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; জঙ্গলমহলের যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান ও শিক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে। যদিও প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নবান্ন যেমন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আপসহীন, তেমনই এলাকার সার্বিক উন্নয়নের কাজও দ্রুত গতিতে চলছে। মাধাই পাত্রের আত্মসমর্পণ এবং শ্রদ্ধা বিশ্বাসের গ্রেফতারি যে আগামী দিনে নকশালপন্থী সংগঠনগুলোর ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। জঙ্গলমহলে শান্তির নতুন সূর্যোদয় হয় কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।





