চীনের সামরিক আদালতের এক নজিরবিহীন রায়ে উত্তাল আন্তর্জাতিক রাজনীতি। দুর্নীতির অভিযোগে প্রাক্তন দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং জেনারেল ওয়েই ফেংহে ও লি শাংফুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে চীনের আদালত। কিন্তু এই শাস্তির পেছনে লুকিয়ে আছে বেইজিংয়ের এক রহস্যময় আইনি মারপ্যাঁচ, যাকে বলা হচ্ছে ‘স্থগিত মৃত্যুদণ্ড’।
স্থগিত মৃত্যুদণ্ড ও ‘দুই বছরের পরীক্ষা’
চীনের সামরিক আদালত গত ৭ মে এই দুই জেনারেলকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দেয়। এর সহজ অর্থ হলো, আগামী দুই বছর তারা যদি কোনো নতুন অপরাধ না করেন বা কারাগারের নিয়ম না ভাঙেন, তবে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না। ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই সময়সীমা পার হওয়ার পর মৃত্যুদণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে’ রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, তাদের গোটা জীবন কারাগারের চার দেওয়ালের মাঝেই কাটবে, কিন্তু এখনই প্রাণ হারাবেন না। তবে দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত এই হাই-প্রোফাইল অফিসাররা কখনোই প্যারোলে মুক্তি পাবেন না।
বিলাসবহুল কারাগার নাকি ‘ক্লাব ফেড’?
সাধারণ বন্দীদের সাথে চীনের আচরণ অত্যন্ত কঠোর হলেও, এই দুই প্রাক্তন মন্ত্রীর ঠাঁই হচ্ছে বেইজিংয়ের কুখ্যাত ‘কিনচেং কারাগারে’। ১৯৫৮ সালে সোভিয়েত সহায়তায় নির্মিত এই হাই-সিকিউরিটি জেলটি আসলে প্রভাবশালী দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের জন্য একটি ‘বিলাসবহুল খাঁচা’। সাধারণ কয়েদিরা যখন আধপেটা খেয়ে জীর্ণ পোশাকে শ্রম দেয়, তখন কিনচেং-এর বন্দীরা পায় বিশেষ সুবিধা।
এখানে কক্ষগুলো বেশ বড়, যেখানে সংযুক্ত বাথরুম, সোফা, ডেস্ক, এমনকি টেলিভিশন ও ওয়াশিং মেশিনের সুবিধা রয়েছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ হলো এখানকার খাবারের মেনু। দিনে দুবার পরিবেশিত খাবারে মাছ বা মাংসের পদ থাকে। সাথে থাকে পুষ্টিকর স্যুপ, সপ্তাহে একদিন দুধ ও ফল। এক সময় হোটেল শেফরা এখানকার বন্দীদের জন্য রান্না করতেন বলে শোনা যায়। এমনকি এই কারাগারে বন্দীদের নিজস্ব সিভিল ড্রেস বা স্যুট পরারও অনুমতি থাকে।
শি জিনপিংয়ের ‘ক্লিন আপ’ মিশন
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে শি জিনপিং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছেন। লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এটি আসলে দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি কৌশল। এই দুই হাই-র্যাঙ্কিং জেনারেলকে কঠোর শাস্তি দিয়ে জিনপিং আসলে সামরিক বাহিনীকে কড়া বার্তা দিতে চাইছেন যে, আনুগত্যহীনতা বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।
চীনের কারাগার ব্যবস্থা অত্যন্ত গোপনীয়। প্রতি বছর ঠিক কত মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান বেইজিং প্রকাশ করে না। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলোর মতে, এই সংখ্যা কয়েক হাজার। কিনচেং কারাগারে মাও জে দং-এর স্ত্রীসহ অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব বন্দী ছিলেন। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলেন দুই প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।





