লাল দুর্গের শেষ বাতিটিও নিভল! ২০২৬-এর নির্বাচনে ভারত কি সম্পূর্ণ ‘বাম-মুক্ত’?

১৯৫৭ সালের ৫ এপ্রিলের সেই সকালটি ছিল ভারতীয় রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মোড়। ইলাম কুলাম মনক্কলম শঙ্করন নাম্বুদরীপাদ (ইএমএস) যখন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছিলেন, তখন খোদ আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নও চমকে গিয়েছিল। বন্দুকের নল নয়, বরং ব্যালট বক্সের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার গঠন করে ইতিহাস গড়েছিলেন এই ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবারের সন্তান। কিন্তু আজ, ২০২৬ সালের নির্বাচনী ফলাফল সেই ইতিহাসের পাতায় এক বিষণ্ণ যবনিকা টেনে দিল। কেরলের পতনের সাথে সাথেই ভারতের মানচিত্র থেকে মুছে গেল লাল ঝাণ্ডার শেষ প্রশাসনিক অস্তিত্ব।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও নেহরুর সেই প্রশ্ন
ইএমএস সরকার ক্ষমতায় এসেই জমিদারি প্রথা বিলোপ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু এই সংস্কারই কাল হয়ে দাঁড়ায়। চার্চ, নায়ার সার্ভিস সোসাইটি এবং কংগ্রেস একজোট হয়ে ‘বিমুক্তি সমরম’ বা মুক্তি সংগ্রাম শুরু করে। অশান্ত কেরলের পরিস্থিতি দেখতে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ইএমএস-কে প্রশ্ন করেছিলেন, “এত অল্প সময়ে আপনি এত শত্রু কীভাবে তৈরি করলেন?” নেহরু দ্বিধাগ্রস্ত থাকলেও তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন অনড়। ফলস্বরূপ, ১৯৫৯ সালের ৩১ জুলাই ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে মাত্র ২৮ মাসের মাথায় একটি নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করা হয়। সেই দিনটি ছিল ভারতীয় সংবিধানের প্রথম বড় অপব্যবহারের সাক্ষী।

বাংলার পতন ও অস্তিত্বের সংকট
১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যে বাম শাসন নেই। এক সময় যে আদর্শের হুঙ্কার জেএনইউ থেকে যাদবপুর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিত, আজ তা সোশ্যাল মিডিয়ায় কেবল একটি হ্যাশট্যাগে সীমাবদ্ধ। বাংলার কথা ধরলে, জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে টানা ৩৪ বছরের শাসন ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম নির্বাচিত কমিউনিস্ট সরকার। ‘অপারেশন বর্গা’ বা পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাধ্যমে বামপন্থীরা গরিব মানুষের মসিহা হয়ে উঠেছিল। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাডার রাজ এবং সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ আন্দোলন সব সমীকরণ বদলে দেয়। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝড়ে ভেঙে পড়ে ৩৪ বছরের লাল কেল্লা। আজ সেখানে বামেদের অস্তিত্ব কার্যত শূন্য।

ত্রিপুরা ও কেরলের ট্র্যাজেডি
ত্রিপুরায় মানিক সরকার ২০ বছর মুখ্যমন্ত্রী থেকেও নিজের একটি বাড়ি পর্যন্ত করেননি। কিন্তু ২০১৮ সালে সেখানেও পদ্ম ফুটেছিল। লেনিনের মূর্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া ছিল একটি যুগের অবসানের প্রতীক। সবশেষে আশা ছিল কেরলকে ঘিরে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালে পিনরাই বিজয়ন টানা দুবার জিতে ইতিহাস গড়লেও ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ৪ লক্ষ কোটির ঋণের বোঝা, বেকারত্ব এবং সোনা পাচার কেলেঙ্কারির মতো দুর্নীতির অভিযোগে সরকার ছিল কোণঠাসা। যুব সমাজ কাজের সন্ধানে আজও উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিনিয়োগের অভাব এবং শবরীমালা বিতর্কের মতো বিষয়গুলি বামেদের জনভিত্তি আলগা করে দিয়েছিল।

অস্তিত্বের শেষ মোড়ে দাঁড়িয়ে
আজ থেকে ১০০ বছর আগে ১৯২৫ সালে আরএসএস এবং সিপিআই—দুটি আদর্শবাদী সংগঠন জন্ম নিয়েছিল। আজ আরএসএস-অনুপ্রাণিত বিজেপি ১৭টি রাজ্যে ক্ষমতায়, অন্যদিকে কম্যুনিস্টরা শূন্যে এসে ঠেকেছে। পিনরাই বিজয়নের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল খুনের অভিযোগ দিয়ে, আজ তাঁর বিদায় ঘটছে একরাশ ব্যর্থতা আর দুর্নীতির কলঙ্ক নিয়ে। এটা কি কেবল একটি নির্বাচনী পরাজয়, নাকি এক শতাব্দী প্রাচীন আদর্শের চিরস্থায়ী প্রস্থান? ২০২৬-এর ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে একটি নির্দিষ্ট রঙ হয়তো পাকাপাকিভাবে ফিকে হয়ে গেল।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy