জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক লড়াকু পরিবারের কাহিনী এবার বাংলার জয়গাথা হয়ে উঠল। প্রতিকূল পরিস্থিতি যে মেধার পথে বাধা হতে পারে না, তা আরও একবার প্রমাণ করল ২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল। উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জ সারদা বিদ্যামন্দিরের ছাত্র অভিরূপ ভদ্র এখন গোটা রাজ্যের গর্ব। ৭০০ নম্বরের মধ্যে ৬৯৮ (৯৯.৭১ শতাংশ) পেয়ে সে রাজ্যের মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে। তবে এই রাজকীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক নিঃশব্দ লড়াই এবং এক জননীর অদম্য জেদ।
অভিরূপের যখন ছোট, তখনই তাঁর মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে যায়। একমাত্র ছেলেকে মানুষ করার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ে মা ইন্দ্রাণী চৌধুরী ভদ্রের কাঁধে। পেশায় রায়গঞ্জ হাসপাতালের স্টাফ নার্স ইন্দ্রাণী দেবী রাত-দিন এক করে পরিশ্রম করেছেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। হাসপাতালের ব্যস্ত ডিউটি সামলেও ছেলের পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র খামতি রাখেননি তিনি। আজ অভিরূপের এই আকাশচুম্বী নম্বর সেই মায়ের ত্যাগেরই যোগ্য সম্মান।
রুটিন এবং ৯ গৃহশিক্ষক:
অভিরূপের এই অভাবনীয় সাফল্যের ফর্মুলা কী? সে জানায়, পড়াশোনার কোনও শর্টকাট নেই। প্রতিদিন রুটিন মেনে নিখুঁত অনুশীলনই তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে—অভিরূপের ছিল ৯ জন গৃহশিক্ষক। প্রতিটি বিষয়কে গভীরভাবে বোঝার জন্য সে শিক্ষকদের সাহায্য নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল গুরুত্ব ছিল নিজের অধ্যাবসায়ে। অভিরূপের মতে, গৃহশিক্ষকদের নির্দেশ আর নিজের সময়ের সঠিক ব্যবহারই এই ফলের আসল চাবিকাঠি।
ভবিষ্যতের নীল নকশা:
মাধ্যমিকের বাধা পেরিয়ে অভিরূপ এখন আরও বড় স্বপ্নের পথে। তার লক্ষ্য দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইআইটি (IIT)। ভবিষ্যতে নিজেকে একজন সফল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেখতে চায় সে। অভিরূপের কথায়, “উচ্চ মাধ্যমিকের আগামী দু’বছর আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। জয়েন্ট এন্ট্রান্সের প্রস্তুতির পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ে আরও বেশি সময় দিতে হবে। আমি সেই পরিশ্রমের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত।”
রাজনীতি ও আদর্শ:
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চারদিকে যখন উত্তপ্ত আলোচনা, তখন কিন্তু কৃতি এই ছাত্র বেশ সংযত। রাজনীতি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়া হলে অভিরূপ অত্যন্ত পরিণত মনস্কতার পরিচয় দেয়। সে জানায়, “রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করার মতো অভিজ্ঞতা বা বয়স আমার এখনও হয়নি। তাই এই বিষয়ে এখনই কিছু বলতে চাই না।” সাফল্যের তুঙ্গে থেকেও এই সাধারণ জীবনবোধই অভিরূপকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। রাজ্য সেরার এই কাহিনী এখন হাজারো স্বপ্ন দেখা পড়ুয়াদের কাছে অনুপ্রেরণা।





