২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে গিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের একাধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূলের পতন এবং বিজেপির উত্থান বাংলার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মাত্র ৮০টি আসনে থমকে যাওয়া তৃণমূল যখন কোণঠাসা, তখন ২০৭টি আসন নিয়ে দাপট দেখাচ্ছে গেরুয়া শিবির। কিন্তু এই সাংবিধানিক ডামাডোলের মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে অপেক্ষা করছে সবথেকে কঠিন চ্যালেঞ্জ।
সামনে ‘মিনি বিধানসভা’ ভোট
বিধানসভায় পরাজয়ের ক্ষত এখনও টাটকা। এরই মধ্যে কড়া নাড়ছে কলকাতা পুরসভা (KMC) নির্বাচন। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসেই কলকাতার ১৪৪টি ওয়ার্ডে ভোট হওয়ার কথা। এরপরই আসবে ২০২৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্থানীয় নির্বাচনগুলোই ঠিক করে দেবে তৃণমূলের শিকড় কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে।
কেন এই লড়াই মমতার জন্য মরণ-বাঁচন?
২০১১ সাল থেকে তৃণমূল যখনই কোনো স্থানীয় নির্বাচনে লড়েছে, সবসময় তারা শাসক দলের তকমা ও প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছে। এই প্রথমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী আসনে বসে পুরসভা ও পঞ্চায়েত রক্ষা করতে হবে।
পুরসভার পরীক্ষা: ২০২১-এর পুরভোটে ১৪৪টির মধ্যে ১৩৪টি আসন জিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল তৃণমূল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটাররা কি এখনও ঘাসফুলের পাশে আছেন?
পঞ্চায়েতের লড়াই: ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রায় একচেটিয়া আধিপত্য ছিল তৃণমূলের। কিন্তু ২০২৬-এর ফলের নিরিখে দেখা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গ তো বটেই, এমনকি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ, মালদা বা উত্তর দিনাজপুরেও তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ধস নেমেছে।
দলবদলের আশঙ্কা ও গ্রামীণ আধিপত্য
তৃণমূলের অন্দরে এখন সবথেকে বড় ভয় হলো ‘দলবদল’। বাংলায় চিরকালই দেখা গিয়েছে, ক্ষমতায় যে দল থাকে, পঞ্চায়েত স্তরের কর্মীরা সেদিকেই ঝুঁকে পড়েন। বিজেপি যদি ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রাজ্যে সরকার গড়ে, তবে গ্রামীণ স্তরের সংগঠনের রাশ ধরে রাখা মমতার পক্ষে হিমালয় জয়ের সমান হবে। মুর্শিদাবাদে ২২টির মধ্যে ২০টি আসন পাওয়া তৃণমূল এবার নেমে এসেছে মাত্র ৯টিতে। এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে গ্রামীণ বাংলায় ঘাসফুল কতটা টালমাটাল।
আসল পরীক্ষা রাজনৈতিক অস্তিত্বের
ভবানীপুর কেন্দ্রে নিজে পরাজিত হওয়ার পরও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে ব্যালট বক্স বা ইভিএম-এর লড়াই হবে আসল ময়দানে।
পুরসভায় ভালো ফল: মানে হবে শহরের মানুষ এখনও মমতাকে চাইছেন।
পঞ্চায়েতে জয়: প্রমাণ করবে গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক এখনও নেত্রীর পাশেই আছে।
কিন্তু ফলাফল যদি এর উল্টো হয়, তবে তা স্পষ্ট করে দেবে যে ২০২৬-এর পরাজয় স্রেফ কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল বাংলায় তৃণমূল যুগের অবসানের শুরু। ডেইলিয়ান্ট-এর পাঠকদের নজর এখন ডিসেম্বরের কলকাতা পুরসভার দিকে—সেখানেই নির্ধারিত হবে বাংলার রাজনীতির পরবর্তী গতিপথ।





