এক ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন পটপরিবর্তনের সাক্ষী থাকল ভারতের তিন রাজ্য। যে ফলাফলের কথা অতিবড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকও হয়তো কল্পনা করতে পারেননি, আজ তা বাস্তব। পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু এবং কেরল—তিন রাজ্যের ক্ষমতাচ্যুত হলেন হেভিওয়েট মুখ্যমন্ত্রীরা। নিজেদের ‘গড়’ হিসেবে পরিচিত বিধানসভা কেন্দ্রেই লজ্জাজনক হারের মুখে পড়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এম. কে. স্ট্যালিন। কেরলে পিনারাই বিজয়ন নিজের আসন রক্ষা করতে পারলেও ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বাম শিবির।
বাংলায় কি তবে দুর্নীতির মাসুল দিল তৃণমূল?
পশ্চিমবঙ্গে কার্যত ‘সুনামি’র আকার নিয়ে আছড়ে পড়েছে গেরুয়া ঝড়। খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে ঘাসফুল শিবির। খাস ভবানীপুরে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫,১০৫ ভোটে পরাজিত হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে নেত্রী এক সময় অপরাজেয় ছিলেন, আজ তাঁকে নিজের বিধানসভা কেন্দ্রেই মুখ থুবড়ে পড়তে হলো। কেন এই পতন? রাজনৈতিক মহলের মতে, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ব্যালট বক্সে। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি—একের পর এক কেলেঙ্কারিতে বিদ্ধ হয়েছে রাজ্য সরকার। আরজি কর-কাণ্ড এবং নারী নিরাপত্তার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে প্রশাসন। ডিএ ইস্যুতে সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন এবং কর্মসংস্থানের অভাব মমতার পরাজয় নিশ্চিত করেছে। ‘অনুপ্রবেশ’ এবং ‘রাজনৈতিক হিংসা’র মতো বিষয়গুলিকেও হাতিয়ার করেছে বিজেপি, যার ফলশ্রুতি এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
কেরলে ‘মিথ’ ভাঙল, কিন্তু মুখরক্ষা হলো বিজয়নের
কেরলের রাজনীতিতে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকার বদলের প্রথা ভেঙে ২০২১ সালে রেকর্ড গড়েছিলেন পিনারাই বিজয়ন। কিন্তু ২০২৬-এ এসে সেই ‘কাপ্তান’ আর জাহাজ বাঁচাতে পারলেন না। ধর্মদাম কেন্দ্রে তিনি জিতলেও জয়ের ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ২৪৭-এ। শুরুর দিকে তিনি পিছিয়েও পড়েছিলেন। ভয়াবহ বন্যা এবং ওয়াইনাড ধসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা নিয়ে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগই বিজয়নের পরাজয়ের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ার তীব্রতায় কেরলের মসনদ ছাড়তে হলো এলডিএফ-কে।
তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের ‘সুপারহিট’ এন্ট্রি
সবচেয়ে বড় চমক মিলেছে দক্ষিণ ভারতের এই রাজ্যে। এম. কে. স্ট্যালিন এবং তাঁর দল ডিএমকে-কে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে অভিনেতা বিজয়ের দল ‘টিভিকে’ (TVK)। কোলাথুর কেন্দ্রে খোদ স্ট্যালিন পরাজিত হয়েছেন টিভিকে প্রার্থীর কাছে। উদয়ানিধি স্ট্যালিনের ‘সনাতন ধর্ম’ বিরোধী মন্তব্য থেকে শুরু করে পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে স্ট্যালিন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল চরমে। এককভাবে ১০০-র বেশি আসন জিতে তামিলনাড়ুর ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠেছেন বিজয়।
তিন রাজ্যের এই ফলাফল স্পষ্ট করে দিল, জনগণের ক্ষোভের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে যে কোনো শক্তিশালী দুর্গ। এখন দেখার, এই নতুন শাসকরা জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারেন।





