দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও কলঙ্কিত অধ্যায়ের যবনিকা পড়ল। নিজের দেশের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ এবং অসাংবিধানিক উপায়ে সামরিক শাসন বা ‘মার্শাল ল’ জারি করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল। আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার উচ্চ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংস করার চেষ্টা কোনোভাবেই ক্ষমাযোগ্য নয়। এই রায়ের পর সিওলের রাস্তায় সাধারণ মানুষের উল্লাস দেখা গেলেও, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল কয়েক মাস আগে, যখন উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে আচমকাই দেশে সামরিক শাসন জারি করেছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন। বিরোধী দলগুলিকে স্তব্ধ করতে এবং নিজের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে তিনি সেনাকে রাস্তায় নামিয়েছিলেন। সংসদ ভবন ঘেরাও থেকে শুরু করে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ—সবই চলেছিল তাঁর নির্দেশে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার সচেতন নাগরিক সমাজ এবং বিরোধী দলগুলির তীব্র প্রতিরোধের মুখে সেই সামরিক শাসন স্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উত্তাল জনতা ও সংসদের চাপে তিনি মার্শাল ল তুলে নিতে বাধ্য হন।
পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। তদন্তকারী সংস্থাগুলি দাবি করে, ইউন সুক-ইওল ব্যক্তিগত স্বার্থে দেশের সংবিধানকে পদদলিত করেছেন এবং সেনাকে ব্যবহার করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। মামলার শুনানিতে আদালত মন্তব্য করে, “একজন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রধান কাজ সংবিধান রক্ষা করা, কিন্তু ইউন সুক-ইওল সেই সংবিধানের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।” যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাঁর সমস্ত রাজনৈতিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে এর আগেও রাষ্ট্রপ্রধানদের জেল খাটার নজির রয়েছে, কিন্তু ‘বিদ্রোহ’ বা ‘Treason’-এর দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এক বিরল ঘটনা। ইউন অবশ্য শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে, উত্তর কোরিয়ার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত সেই যুক্তি খারিজ করে দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক রায় বিশ্বের অন্যান্য একনায়কতান্ত্রিক মানসিকতার শাসকদের কাছে এক কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।