মুর্শিদাবাদের ন্যাজাট-কাণ্ডে ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত এবং বর্তমানে জেলবন্দি তৃণমূলের বহিষ্কৃত নেতা শেখ শাহজাহানের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ দায়ের হল। রহস্যজনক গাড়ি দুর্ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া সিবিআই মামলার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষ বৃহস্পতিবার শেখ শাহজাহান-সহ তাঁর সহযোগী মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করেছেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তিনি তাঁর আইনজীবী কালীচরণ মণ্ডলকে সঙ্গে নিয়ে স্থানীয় রাজবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে এই অভিযোগ দায়ের করেন।
খুনের অভিযোগ ও অভিযুক্তদের নাম
-
মামলা: বসিরহাট জেলা পুলিশের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগ দায়েরের পর খুন, খুনের চেষ্টা-সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।
-
অভিযুক্তদের নাম: সাক্ষী ভোলানাথের আইনজীবী কালীচরণ মণ্ডল নিশ্চিত করেছেন যে অভিযোগ পত্রে শাহজাহান ও তাঁর সহযোগীদের নাম রয়েছে। তিনি বলেন, “আলিম মোল্লা, নজরুল মোল্লা-সহ মোট ৮ জনের নামে খুনের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে শাহজাহানের নামও রয়েছে। এটা পরিকল্পিত খুন। এনিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।”
রহস্যের জট ও ট্রাক চালকের গা ঢাকা
গাড়ি দুর্ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরও অভিযুক্ত ঘাতক ট্রাকচালক আব্দুল আলিম মোল্লা এখনও অধরা।
-
রহস্য: ট্রাকচালক কেন পালিয়ে গেল, তার মাথায় কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত রয়েছে কি না এবং কেন পুলিশ এখনও তাকে খুঁজে পাচ্ছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
-
ফরেনসিক তদন্ত: দুর্ঘটনাটি দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র—এই রহস্যের জট খুলতে বৃহস্পতিবার সকালে পাঁচ জনের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল বয়ারমারি পেট্রল পাম্পে গিয়ে ট্রাক ও ভোলানাথের গাড়ি পরীক্ষা করেন। গাড়িগুলির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, মাটি, স্টিয়ারিংয়ে আঙুলের ছাপ এবং সংঘর্ষের দাগের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
-
পলায়ন: দুর্ঘটনাস্থলের ৪০০ মিটার দূরে একটি পেট্রল পাম্পের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া একটি বাইকে চেপেই অভিযুক্ত ট্রাকচালক আব্দুল আলিম মোল্লা পালিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাকে সহযোগিতা করার অভিযোগ উঠেছে নজরুল মোল্লা নামে এক বাসিন্দার বিরুদ্ধে। ট্রাকের মালিক আব্দুল সামাদ মোল্লারও হদিশ মিলছে না।
ভোলানাথের বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘জেলে বসেই খুনের পরিকল্পনা’
ইডি আধিকারিকদের ওপর হামলার ঘটনার অন্যতম সাক্ষী ভোলানাথ ঘোষ। বুধবার শাহজাহানের দায়ের করা একটি পুরনো মামলায় সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার আগেই তিনি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই তাঁর ছোট ছেলে সত্যজিৎ ঘোষ ও গাড়ির চালক শাহানুর আলমের মৃত্যু হয়।
রাজবাড়ি পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ জানানোর পর ভোলানাথ বলেন:
শাহজাহানের সাম্রাজ্য: “জেলে বসেই শাহজাহান তার সাম্রাজ্য চালাচ্ছে। সেখান থেকেই বসে সে খুনের পরিকল্পনা করে।”
আলিম মোল্লার ভূমিকা: তিনি অভিযুক্ত ট্রাকচালক আলিম মোল্লাকে শাহজাহানের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, “আলিম মোল্লা শাহজাহানের হয়েই যত বেআইনি কাজ করে থাকে। লুটপাট, মারধর, গায়ের জোরে ভেড়ি দখল এগুলো ছিল আলিমের কাছে জলভাত।”
ভয়: “আমার আশঙ্কা আমার পুরো পরিবারকে শাহজাহান শেষ করে দেয় কি না, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছি। তবে আমি মনে করি হিংস্র বাঘের দাঁত ভেঙে গেলে সে আর কামড়াতে পারে না। পুলিশ প্রশাসনের ওপর ভরসা রয়েছে।”
সবমিলিয়ে ন্যাজাট-কাণ্ডে পরতে পরতে বাড়ছে রহস্য। এই খুনের মামলাটি শাহজাহান-ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে তদন্তের গতিপথ কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে সকলের।