দীর্ঘ নয় মাসের অনিশ্চয়তা, যন্ত্রণা এবং আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে নিজের বাড়িতে ফিরলেন বীরভূমের সোনালি বিবি। শুক্রবার মালদহ সীমান্ত পেরিয়ে যখন তিনি পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে পা রাখেন, তখন তাঁর চোখে স্বস্তি ও কান্নার এক মিশ্র রেশ। কোলের কাছে আট বছরের সন্তানকে আগলে বাড়ির দরজায় পা রাখতেই আবেগ সামলাতে পারেননি এই লড়াকু মা।
⚖️ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নাটকীয় মুক্তি
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত জুন মাসে। দিল্লিতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে সোনালিসহ মোট ছয়জনকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। অভিযোগ, তাঁকে ‘পুশ ব্যাক’ করার সময় সোনালি ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। এরপর ২০ অগস্ট বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ কয়েক মাস তাঁদের ঠাঁই হয় সংশোধনাগারে।
তবে এই ঘটনায় মানবিক দিকটি সামনে আনতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। গত বুধবার সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে কড়া নির্দেশ দেয়— অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবি ও তাঁর সন্তানকে যেন অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি, দেশে ফেরার পর তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্বও কেন্দ্রকেই নিতে হবে।
শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তোলে, একজন নাগরিককে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করার পদ্ধতি কতটা নির্ভুল এবং কতটা মানবিক? এই প্রশ্নই সোনালির মুক্তির পথ প্রশস্ত করে।
🏡 বাড়ি ফেরা ও আবেগঘন অভ্যর্থনা
আদালতের নির্দেশ মেনে শুক্রবার সোনালি ও তাঁর ছেলেকে মালদহ সীমান্ত দিয়ে দেশে ফেরানো হয়। বিএসএফের হেফাজত থেকে তাঁদের প্রথমে মালদহ মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল বলে জানালে, শনিবার দুপুরে তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়।
বাড়ি ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বীরভূমের পাইকর এলাকায় ভিড় জমে যায়। প্রতিবেশীরা ফুল দিয়ে বরণ করে নেন সোনালিকে। এরপর বিশ্রামের পর তাঁকে রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয় আরেক দফা চেক-আপের জন্য। হাসপাতাল সূত্রে মা ও শিশু আপাতত ভালো আছেন বলে জানানো হয়েছে।
নিজের দীর্ঘ কষ্টের কথা ভুলে সোনালি বলেন,
“আমি এখন ঠিক আছি। শরীরে বিশেষ অসুবিধা নেই।”
তবে তাঁর একমাত্র দাবি, বাংলাদেশে আটক থাকা পরিবারের বাকি সদস্যদেরও যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
🎙️ রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ বিতর্ক
এই দীর্ঘ লড়াইয়ে শুরু থেকেই সোনালির পাশে ছিলেন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান ও তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম। তিনি বলেন,
“একজন মায়ের লড়াইয়ের জয় হয়েছে। বাকিরাও যাতে দ্রুত ফিরতে পারেন, তার জন্য আমাদের লড়াই চলবে। বাংলাভাষী মানুষকে ভিনরাজ্যে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতি আমরা মানি না।”
বাংলার এই নাগরিকের ঘরে ফেরা মানবিকতা ও আইনি অধিকারের এক বড় জয় হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।