ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের আগে বাংলা কাঁপিয়েছিলেন যিনি, অবহেলিত রানি শিরোমণি গড় পুনর্জাগরণের পথে! বাংলার ইতিহাস কি এবার বাঁচানো যাবে?

চুয়ার বিদ্রোহের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম রানি শিরোমণি। তাঁর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক কর্ণগড় দীর্ঘদিন ধরে ছিল অবহেলিত ও ভগ্নদশা। অবশেষে সেই অবসান ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো এই ঐতিহাসিক গড়টির বহুল প্রতীক্ষিত পুনর্নির্মাণ ও সংরক্ষণ কাজ।
নবান্ন সূত্রে খবর, রাজ্য সরকার কর্ণগড়ের সার্বিক সংস্কারের জন্য প্রায় ২.৫ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে। টাকার ছাড়পত্র পাওয়ায় স্থাপত্যের সূক্ষ্ম পুনর্নিমাণ, ভগ্নদশা অংশগুলির অপসারণ এবং প্রাচীন কাঠামো সংরক্ষণের কাজ গতিশীল হয়েছে।
👑 রানি শিরোমণি: বাংলার বিদ্রোহের প্রতীক
বিদ্রোহের নেত্রী: ১৮০০ শতকের শেষ ও ১৯০০ শতকের শুরুর দিকে যখন কৃষকদের চুয়ার বিদ্রোহ ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে মাথা তুলেছিল, তখন কর্ণগড় ছিল সেই বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র।
সাহসী নেতৃত্ব: রানি শিরোমণি রাজকোষের অর্থ ব্যয় করে বিদ্রোহীদের সাহায্য করতেন এবং নিজের লোকবল সংগঠিত করে লড়াইকে শক্তিশালী করেছিলেন।
ইতিহাসের তুলনা: ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাইয়ের জন্মের প্রায় এক দশক আগেই বাংলায় রানি শিরোমণি নারী নেতৃত্ব ও যুদ্ধদক্ষতার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন।
শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি: রানি শিরোমণির সংগ্রাম ও আত্মোৎসর্গ আগামীর প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে শিক্ষা দফতর তাঁর ভূমিকা স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
🏰 ১২০ বিঘা জুড়ে বিস্তৃত ঐতিহাসিক কাঠামো
পশ্চিম মেদিনীপুরে প্রায় ১২০ বিঘা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত ছিল রানি শিরোমণির মহল ও প্রশাসনিক কাঠামো। বর্তমানে এখানে ল্যাটেরাইট পাথরের প্রাচীন গঠন, জলহরি, হাওয়া মহল এবং আটচালা শৈলীর একাধিক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সংগঠনগুলি এই ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি জানাচ্ছিল, কারণ সঠিক উদ্যোগ না নিলে এর বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
🛠️ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশ্বাস পূরণ
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তত্ত্বাবধানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এবং জনপথ বিভাগ (পিডব্লিউডি) যৌথভাবে এই পুনর্নির্মাণের কাজ পরিচালনা করবে। ঠিকাদার সংস্থাকে ৩০০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পর্যটন কেন্দ্র: তিন বছর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কর্ণগড় পরিদর্শন করে এটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই আশ্বাস পূরণে ইতিমধ্যেই সড়ক উন্নয়ন, আলো বসানো এবং পার্কিং জোন নির্মাণ-সহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
অর্থনৈতিক গতি: গড়ের পুনর্নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে পশ্চিম মেদিনীপুরের এই ঐতিহাসিক স্থানটি রাজ্যের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি আনবে।
প্রত্নতত্ত্ব দফতরের আশা, এই সংস্কার শুধু স্থাপত্য রক্ষাই নয়, এটি বাংলার বিদ্রোহ, সাম্য এবং আত্মমর্যাদার ইতিহাসকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার এক প্রচেষ্টা।