এটি এক অন্যরকমের প্রেমের গল্প—যার সমাপ্তি ঘটল প্রতারণার দংশনে। অনলাইন ‘ম্যাট্রিমোনিয়াল’ ওয়েবসাইটকে হাতিয়ার করে অন্তত ২০ জন তরুণীর কাছ থেকে কোটি টাকার প্রতারণা করেছে একটি চক্র। হুগলীর সিঙ্গুরের এক তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে এই ভয়ঙ্কর সাইবার জাল উন্মোচন করেছে হুগলী গ্রামীণ পুলিশ।
যেভাবে পাতানো হয়েছিল ফাঁদ
শুরু: সিঙ্গুরের ২৯ বছরের ওই তরুণী জানান, গত বছর ডিসেম্বরে এক বিবাহ সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে ‘অনুপম রায়’ নামে এক যুবকের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়।
পরিচয়: যুবকটি নিজেকে বর্ধমানের এক চালের কলের মালিক বলে পরিচয় দেয়।
প্রতারণার অজুহাত: প্রেম গভীর হলে অনুপম জানায় যে, আয়কর দপ্তরের সমস্যার কারণে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ হয়ে গেছে। সে প্রেমিকাকে তার ‘উদ্ধারের’ জন্য সাহায্য করতে অনুরোধ করে।
আবেগের বশে অর্থহানি: প্রথমে কিছু হাজার, পরে লক্ষ, এভাবে তরুণী প্রায় ৯ লক্ষ টাকা পাঠান। এমনকি আবেগতাড়িত হয়ে পাত্রীর মা ও দিদিমাও টাকা পাঠান। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ভুয়ো ডিপোজিট স্লিপ দেখিয়ে অনুপম তাদের বিশ্বাস অর্জন করে। নতুন নতুন অজুহাত ও নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা বলে চলতে থাকে অর্থ হাতানোর খেলা। শেষ পর্যন্ত এই পরিবার ৪৩ লক্ষ টাকা খুইয়েছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন: এপ্রিলের পর থেকে যুবকের প্রোফাইল উধাও, ফোনও অচল হয়ে গেলে তরুণী সাইবার সেলে অভিযোগ দায়ের করেন।
পুলিশি তদন্তে উন্মোচন:
তদন্তে নেমে হুগলী পুলিশ জানতে পারে, যার অ্যাকাউন্টে টাকা গিয়েছিল, সেই ৩২ বছরের মডেল অভিষেক রায়-কে প্রথম গ্রেফতার করা হয়। তার সূত্র ধরে ধরা পড়ে এই চক্রের মূল হোতা জাহির আব্বাস (৪১) ও তার ভাই জামির আব্বাস (৩১)। জামিরকে ১৪ অক্টোবর মন্দারমণির এক রিসর্ট থেকে গ্রেফতার করা হয়।
সাইবার সাম্রাজ্য ও ক্ষয়ক্ষতি:
পদ্ধতি: খানাকুলের বাসিন্দা আব্বাস ভাইরা দক্ষিণ ভারতীয় এক মডেলের ছবি ও ভিডিও চুরি করে ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করত। তারা নাম পাল্টে কখনও অনুপম রায়, কখনও রবি সেন, আবার কখনও সুজয় মিত্র নামে প্রতারণা চালাত।
প্রসার: বর্ধমান, হাওড়া, তারকেশ্বর থেকে শুরু করে দিল্লি পর্যন্ত ছড়িয়েছিল এই জাল।
মোট ক্ষয়ক্ষতি: তদন্তে এখন পর্যন্ত উঠে এসেছে, প্রায় ২০ জন তরুণী তাঁদের ফাঁদে পড়ে কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা হারিয়েছেন।
এই ঘটনায় হুগলী পুলিশ সমাজে বার্তা দিয়েছে: রোম্যান্সের পেছনেও থাকতে পারে অপরাধের ছায়া। তাই অনলাইন সম্পর্ক গড়ার আগে যুক্তি, সতর্কতা, যাচাই এবং ভিডিও কল বা সরাসরি সাক্ষাতের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।