ভূত চতুর্দশী (Bhoot Chaturdashi) মানেই বাঙালি বাড়িতে ১৪ শাক ও ১৪ প্রদীপের রেওয়াজ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে এমন একটি মন্দির আছে, যেখানে ভূত চতুর্দশীর দিন রীতিমতো ভূতেদের ‘ভোগ’ দেওয়া হয় এবং তাদের সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়! এরপর কালীপুজোর রাতে মন্ত্রবলে ফের তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়। বিগত প্রায় ৭৩ বছর ধরে এই অদ্ভুত পরম্পরা চলছে আসানসোলের মহিশীলা কলোনীর পিয়ালবেড়া শ্মশান সংলগ্ন মন্দিরে।
বামাক্ষ্যাপার শিষ্যের কীর্তি:
এই প্রথার মূলে রয়েছেন বামাক্ষ্যাপার অন্যতম প্রধান শিষ্য তান্ত্রিক বনমালী ভট্টাচার্য। প্রায় সাত দশক আগে তিনি আসানসোলের মহিশীলা ১ নম্বর কলোনীর পিয়ালবেড়া শ্মশানের বটগাছে নাকি এলাকার ‘ভূতদের’ বেঁধে দিয়ে গিয়েছিলেন।
জানা যায়, নদিয়া নিবাসী বনমালীবাবু মাত্র ৭ বছর বয়সে বামাক্ষ্যাপার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। রায় পরিবারের জমিদার তাঁকে সাধনা করার জন্য এই নির্জন শ্মশানে জমি দান করেছিলেন। সেই সময় এই পিয়ালবেড়া শ্মশানে ভূতেদের উপদ্রব ছিল বলে শোনা যায়। ফলে রাতে কারও মৃত্যু হলে ভয়ে এলাকাবাসী শ্মশানে যেতে পারতেন না। ভূতেরা এলাকায় যাতে অনিষ্ট করতে না পারে, সেই জন্যই তান্ত্রিক তাদের মন্ত্রবলে একটি গাছে বেঁধে দেন।
বাঁধনছেঁড়ার প্রথা:
বনমালীবাবু এখন আর জীবিত নেই। কিন্তু এলাকার মানুষের বিশ্বাস, এখনও সেই বটগাছে ভূতেদের দল রয়ে গিয়েছে। বর্তমানে তাঁর ছেলে বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য এই পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তিনি জানান, ভূত চতুর্দশীর রাতে কিছু সময়ের জন্য ‘তেনাদের’ মুক্তি দেওয়া হয় বা ‘বাঁধনছাড়া’ করা হয়।
বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য বলেন, কার্তিক অমাবস্যার আগের দিন ভূত চতুর্দশীতে সেখানে কালীপুজো হয়। পুজোর পরে শিবাভোগ ও ভৈরব ভোগ দেওয়া হয়।
ভোগ: মোট তিনবারে এই ভোগ দেওয়া হয়। ভোগে থাকে ভাত, মাংস ও কারণ (মদ)।
পুনরায় বন্দি: ভূত চতুর্দশীতে ভোগ দেওয়ার পর, কালীপুজোর রাত যখন শেষ হয়, তখন ফের সেই অপদেবতাদের মন্ত্রবলে গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়।
পিয়ালবেড়া শ্মশান আজ না থাকলেও, বনমালীবাবুর তৈরি আশ্রমের মন্দির ও পঞ্চমুণ্ডির আসনটি আজও রয়ে গিয়েছে। আসানসোলের এই কালীপুজো লোকবিশ্বাস আর তান্ত্রিক ঐতিহ্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন।