বালি পাচারে ফের সক্রিয় ইডি! পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে বেন্টিংক স্ট্রিট—সাত-আটটি জায়গায় মেগা রেইড

অনেক দিনের বিরতির পর মাসখানেক আগে ৯ সেপ্টেম্বর বালি পাচারের তদন্তে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়েছিল ইডি (ED)। সেই অভিযানে পাওয়া সূত্র ধরেই বৃহস্পতিবার সকালে ফের এক দফা মেগা অভিযান শুরু করল কেন্দ্রীয় সংস্থা। ভোর থেকে একযোগে পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম বর্ধমান এবং কলকাতার বেন্টিংক স্ট্রিট-সহ সাত-আটটি জায়গায় তল্লাশি শুরু করেন ইডি আধিকারিকরা।

গত মাসের অভিযানে বিপুল অংকের টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের বালি ব্যবসায়ী সৌরভ রায়ের বাড়িতে হানা দিয়ে ৬৫ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়। একই দিনে গোপীবল্লভপুরের এক ব্যবসায়ীর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয়েছিল ২৫ লক্ষ টাকা।

তালাবন্ধ অফিস, সচল খাদান
আগের দিনের সূত্রের উপর ভিত্তি করে এদিন সকাল থেকে ফের তল্লাশি শুরু হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের উপস্থিতিতে আধিকারিকদের একাধিক দল বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে।

সৌরভ রায়ের খাদান: লালগড়ের সিজুয়ায় সৌরভের খাদান রয়েছে বলে খবর। এদিন সকালে ইডি আধিকারিকদের দল সেখানে পৌঁছলে দেখা যায়, খাদানে তখন বালি তোলা হচ্ছিল এবং লরির সারি দাঁড়িয়েছিল। তবে যার পরিচালনায় এ কাজ হচ্ছে, এমন কাউকে সেখানে তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায়নি। খাদান লাগোয়া অফিস তালাবন্ধ ছিল। পরে কর্মীদের ডেকে পাঠানো হয়।

গোপীবল্লভপুরের অফিস: গোপীবল্লভপুরের সুমিত্রাপুরে সৌরভের একটি দোতলা অফিস রয়েছে। সেটিও তালাবন্ধ ছিল। আধিকারিকরা সৌরভের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সেটি ছিল সুইচড অফ।

আসানসোল ও কলকাতা: আসানসোলে বালি ব্যবসায়ী মণীশ বাগারিয়ার তিনতলা প্রাসাদোপম বাড়িতেও ভোর ৬টা নাগাদ হানা দেয় সংস্থা। মুর্গাশোলের বাড়িতে সেই সময় মণীশ উপস্থিত ছিলেন না। একই সঙ্গে কলকাতার ডালহৌসি চত্বরের বেন্টিংক স্ট্রিটে একটি অফিসেও তদন্তকারীরা পৌঁছন, সেটিও বন্ধ ছিল।

বালি উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে থেকে বালি তুলে পাচার করার অভিযোগ রয়েছে, আর এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরাই কেন্দ্রীয় সংস্থার নিশানায়।

শাহজাহানের বাড়িতে ১৯টি তালা ভাঙলেও কিছুই পেল না ইডি! বাড়ি সিল, জল্পনা জিনিসে সরিয়ে ফেলা নিয়ে
কলকাতা: এর আগে তল্লাশি করতে গিয়ে আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন ইডি আধিকারিকরা। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সন্দেশখালিতে তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের বাড়িতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দেড়শ জন জওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালাল ইডি।

ভাঙ্গল ১৯টি তালা: বাইরের গেট থেকে বাড়ির ভিতর আলমারি, ড্রয়ার মিলিয়ে মোট ১৯টি তালা ভাঙেন ইডি কর্মকর্তারা। কারণ সমস্ত দরজা ও আলমারিতে তালা লাগানো ছিল।

কী পাওয়া গেল: এত তালা ভেঙেও ইডি প্রায় কিছুই পেল না। নিচের তলার ঘর থেকে কিছু নথি ও ৫০০ টাকার অচল পুরনো নোট পাওয়া গেছে, যা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আলমারি ও ড্রয়ারে মূলত বাড়ির সরঞ্জাম ও পোশাক ছিল। ইডি যে সামান্য জিনিস পেয়েছে, তার মধ্য়ে আছে, এলআইসি সার্টিফিকেট, দুটি গয়নার বিল, বিমানের টিকিট, নির্বাচনী ফর্ম ও অন্য কিছু নথি।

নোটিশ ও সিল: ইডি যখন তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন শেখ শাহজাহান বা তাঁর পরিবারের কেউ বাড়িতে ছিলেন না। ইডি শাহজাহানের বাড়ির দেওয়ালে নোটিশ লাগিয়ে দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ২৯ জানুয়ারি শাহজাহানকে ইডি-র অফিসে যেতে হবে। তল্লাশি শেষে শাহজাহানের বাড়ি সিল করে দেওয়া হয়।

শাহজাহানের এক ঘনিষ্ঠ অনুগামী আনন্দবাজারকে জানিয়েছেন, মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ও রেশনকাণ্ডে অভিযুক্ত বাকিবুর রহমানকে ইডি গ্রেপ্তার করার পরেই শাহজাহান সব কাগজপত্র ও জিনিসপত্র অন্যত্র সরিয়ে ফেলেন। বাকি যা জিনিস ছিল, তা ৫ জানুয়ারি রাতে শাহজাহানের অনুগামীরা সরিয়ে ফেলে।

ইডি-সিবিআই কি রাজনৈতিক হাতিয়ার? তাপস রায়ের দলবদলের পর তল্লাশি না হওয়ায় প্রশ্ন
বালি পাচার এবং পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডি-সিবিআইয়ের তদন্তে নতুন গতি আসায় ফের সেই পুরোনো প্রশ্ন উঠেছে: কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা কি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?

সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্যের মন্তব্য: সাংবাদিক সুমন ভট্টাচার্য বলেন, “ইডি ও সিবিআইয়ের তদন্তকে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করলে দেখা যাবে, এর আগে তদন্তকারী সংস্থা তৃণমূলের দুজন সিনিয়র নেতার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিল—তাপস রায় ও সুজিত বসু। এক বছর পরে আবার সুজিত বসুর বাড়িতে অভিযান চালানো হলো। কিন্তু তাপস রায় যেহেতু দল বদলে ফেলেছেন, তাই তাঁর বাড়িতে অভিযান হলো না। তাহলে কি তাপস রায়ের বিরুদ্ধে আর কোনো অভিযোগ থাকল না?” তাঁর মতে, ইডি-সিবিআই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিজেপি নেতার জবাব: বিজেপি নেতা ও পর্যবেক্ষক বিমলশঙ্কর নন্দ পাল্টা বলেন, “দুর্নীতির তদন্ত কখনো সময়সীমা বেঁধে হয় না। পর্যাপ্ত তথ্য হাতে এলে তদন্তকারী সংস্থা ফের কাজ শুরু করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল শুধু অন্যায় করে না, অন্যায় ধামাচাপা দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত।”

বিজেপির অসন্তোষ: এদিকে, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত খোদ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সম্প্রতি এনিয়ে নিজের অসন্তোষ জানিয়েছেন। বিমলশঙ্কর নন্দ বলেন, “কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির আরো সক্রিয় হওয়া উচিত। মাঝে মাঝে তদন্তে দেরি হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বার্তা যাচ্ছে যে, তদন্তকারীরা ঠিকভাবে কাজ করছেন না। এই বদনাম ঘোচাতে তাদের দ্রুত তদন্ত চালানো উচিত।”

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy