মুম্বইয়ের রাস্তায় ‘মৃত্যুফাঁদ’- সরকারি তথ্যে ‘শূন্য’ মৃত্যু, তবে মহারাষ্ট্রে গর্তে প্রাণ গেল ১৫৮ জনের!

মুম্বই: মুম্বইয়ের বর্ষা মানেই জল জমা, ভাঙা রাস্তা আর বিপজ্জনক গর্তের (Potholes) আতঙ্ক। অথচ সরকারি তথ্য বলছে, ২০২০ সাল থেকে মুম্বই শহরে রাস্তার গর্ত বা খানাখন্দের কারণে মৃত্যু বা আহতের সংখ্যা ‘শূন্য’! এই তথ্য ঘিরে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রকের (MoRTH) ‘Road Accident in India’ রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, মুম্বই ছাড়াও মহারাষ্ট্রের অন্যান্য প্রধান শহর—নাগপুর, নাসিক এবং পুণেতেও ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গর্ত-জনিত কোনো মৃত্যু বা আঘাতের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়নি।

২০১৯ সালে মুম্বইয়ে একটি গর্ত-জনিত মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, কিন্তু তার পর থেকে সরকারি খাতায় মুম্বই ‘নিরাপদ’। যদিও এই তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

তথ্য-বিভ্রাট নাকি ‘আন্ডাররিপোর্টিং’?
MoRTH-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সারা ভারতে ৫,৮০০টিরও বেশি গর্ত-জনিত দুর্ঘটনা এবং ২,১৬১টি মৃত্যু হয়েছে। মহারাষ্ট্রে একই বছরে ৬১টি দুর্ঘটনা এবং ২৯টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।

কিন্তু বড় শহরগুলির ‘শূন্য’ পরিসংখ্যানের বিপরীতে, মুম্বইয়ের আশেপাশে অনলাইন সার্চ করলেই একাধিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসে। যেমন, ২০২১ সালের কুরলার ঘটনাটি, যেখানে এক ৩২ বছর বয়সী যুবক তার স্ত্রী ও দুই বছরের কন্যাসহ বাইক নিয়ে গর্তে পড়ে মারা যান।

MoRTH-এর একজন কর্মকর্তা News18-কে জানিয়েছেন, মুম্বই বা অন্যান্য প্রধান শহরগুলিতে প্রায়-শূন্য পরিসংখ্যানের কারণ হতে পারে ‘আন্ডাররিপোর্টিং’। তিনি বলেন, “এই ধরনের মৃত্যুগুলিকে হয়তো ‘নিয়ন্ত্রণ হারানো’ বা ‘স্কিডিং’-এর মতো অন্য বিভাগে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যা গর্ত-জনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও হতে পারে।”

অন্যদিকে, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-এর তথ্যের সঙ্গেও MoRTH-এর তথ্যের কোনো মিল নেই। NCRB-এর মতে, ২০২২ সালে মুম্বইয়ের রাস্তায় ৩৭১ জন মারা গিয়েছিলেন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৩৮৪ হয়েছে।

হাইকোর্টের কড়া রায়: মৃত্যুতে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ
সরকারি তথ্যের এই বিভ্রান্তির মধ্যেই মুম্বই হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে, খারাপ রাস্তার কোনো অজুহাত চলতে পারে না।

হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, রাস্তার গর্ত বা খোলা ম্যানহোলের কারণে কারও মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এর পাশাপাশি, সিভিক বডি এবং ঠিকাদারদের জন্য কঠোর জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

হাইকোর্ট বলেছে, ক্ষতিপূরণ দিতে হবে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন, এমএমআরডিএ, এমএসআরডিসি, এনএইচএআই এবং পিডব্লিউডি-এর মতো কর্তৃপক্ষকে।

গর্তের মৃত্যু ‘উধাও’, কিন্তু ম্যানহোল হত্যা শীর্ষে
MoRTH-এর তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে গর্তের কারণে মোট ৯,১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মহারাষ্ট্রের সংখ্যা ১৫৮।

গর্তের মৃত্যু সরকারি খাতায় কমে গেলেও, খোলা ম্যানহোলের কারণে মৃত্যু মহারাষ্ট্রে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারতে খোলা ম্যানহোলে মোট ৭০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রে মৃত্যু হয়েছে ১০৬ জনের, যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় এক-সপ্তমাংশ।

পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি সমস্যার সমাধান করতে বা তার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে গেলে প্রথমে সমস্যাটিকে স্বীকার করতে হয়। কিন্তু গর্ত-জনিত মৃত্যুর তথ্যে এই বিশাল ফারাক এটাই প্রমাণ করে যে, রাস্তা সুরক্ষার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার প্রথম ধাপেই বড়সড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

আপনার মতে, সরকারি তথ্যে গর্ত-জনিত মৃত্যুর এই ‘শূন্য’ পরিসংখ্যান কি বাস্তবসম্মত? এই বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা আনা উচিত নয় কি?

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy