জাতীয় সুরক্ষায় নয়া দিগন্ত: ভারতের নিজস্ব ‘অদৃশ্য’ যুদ্ধবিমান AMCA, প্রস্তুত হচ্ছে ১২০টি জেট

নয়াদিল্লি: জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে ভারত এক বিশাল উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে—দেশের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান (Fifth-Generation Stealth Fighter Jet) তৈরি করা। এই মাইলফলক ছুঁতে পারলে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতার (Indigenisation) পথে ভারত আরও একধাপ এগিয়ে যাবে।

অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট (AMCA) প্রকল্পের লক্ষ্য হলো এমন এক যুদ্ধবিমান তৈরি করা, যা আধুনিক রাডার সিস্টেমে প্রায় অসনাক্তযোগ্য (undetectable) থাকবে। এই কৌশলগত পদক্ষেপ সীমান্ত লঙ্ঘনকারী দেশ, যেমন চিন এবং পাকিস্তানকে, কঠোরভাবে প্রতিহত করবে।

বিশ্বের এলিট ক্লাবে ভারত: প্রথম ১০৬ জন কারা?
এই দেশীয় পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটার জেট তৈরি হলে ভারত বিশ্বের ইউএসএ, রাশিয়া এবং চিনের মতো অল্প কয়েকটি দেশের এলিট গ্রুপে যোগ দেবে। ভারতীয় বিমান বাহিনী (IAF) প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের অধীনে তৈরি ১২০টি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করেছে।

প্রতিরক্ষা সূত্র অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে আইএএফ-এর জন্য প্রায় ১২০টি AMCA ফাইটার জেট তৈরি করা হবে এবং ২০৩৫ সাল থেকে এই বিমানগুলি বিমানবাহিনীতে যুক্ত হতে শুরু করবে।

AMCA-র প্রযুক্তি ও খরচ: চোখ ধাঁধানো তথ্য
AMCA-র মূল লক্ষ্য হলো শত্রুর রাডারে ধরা না পড়ে গভীর আক্রমণ করতে সক্ষম বিমান তৈরি করা। এই প্রকল্পের অধীনে দুটি সংস্করণ তৈরি হচ্ছে:

AMCA MK-1: এই সংস্করণে আমেরিকান GE F414 ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে।

AMCA MK-2: এটি ভারত এবং ফ্রান্সের স্যাফ্রান (Safran)-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি ১৩০ কেএন (kN) থ্রাস্ট ইঞ্জিন ব্যবহার করবে। এই যৌথ ইঞ্জিন উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হবে প্রায় $৭.২ বিলিয়ন (প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা)। চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভারত সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত হস্তান্তর (Technological Transfer) এবং মেধাস্বত্ব (Intellectual Property Rights) লাভ করবে।

১২০টি দেশীয় ফাইটার জেটের মোট খরচ প্রায় $১৮ বিলিয়ন (বা প্রায় ১,৫৭,৮৪৪ কোটি টাকা) হতে পারে বলে জানা গেছে। প্রতিটি বিমানের আনুমানিক খরচ পড়বে $১৪০ মিলিয়ন (প্রায় ১২২৮ কোটি টাকা)।

AMCA ফাইটার জেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য (Key Features):
বৈশিষ্ট্য তথ্য
ইঞ্জিন ২৫ টন ওজনের দুটি ইঞ্জিন
সর্বোচ্চ গতি ২৬০০ কিমি/ঘণ্টা (Mach 2.15)
কমব্যাট রেঞ্জ (Combat Range) ১৬২০ কিলোমিটার
ফেরি রেঞ্জ (Ferry Range) ৫৩২৪ কিলোমিটার
সার্ভিস সিলিং (Service Ceiling) ২০,০০০ মিটার (৬৫,০০০ ফুট)
পেলোড ক্ষমতা (Payload Capacity) ৬৫০০ কিলোগ্রাম

Export to Sheets

দেশীয় প্রযুক্তি এবং ‘প্রথম দেখা, প্রথম হত্যা’ ক্ষমতা
AMCA-র পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলিতে ভারতের নিজস্ব উত্তম-AESA রাডার থাকবে, যা ১৫০ কিলোমিটারের বেশি দূর থেকে ফাইটার জেট-আকারের লক্ষ্যবস্তুকে শনাক্ত করতে পারে। এতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) চালিত মাল্টি-সেন্সর ডেটা ফিউশন সিস্টেম, ইনফ্রারেড সার্চ অ্যান্ড ট্র্যাক (IRST) এবং একটি ইন্টিগ্রেটেড ভেহিকেল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম থাকবে।

এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পাইলটকে ‘ফার্স্ট লুক, ফার্স্ট কিল’ (শত্রুকে দেখার আগেই ধ্বংস করার) ক্ষমতা দেবে।

অস্ত্রসজ্জা ও প্রকল্পের সময়সূচি
স্টিলেথ ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে AMCA-র অভ্যন্তরীণ অস্ত্রাগারে ৬টি অ্যাস্ট্রা এমকে-২ (Astra MK-2) ক্ষেপণাস্ত্র বহন করার জন্য পুনরায় নকশা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও, এই ফাইটার জেটে থাকবে দেশীয়ভাবে তৈরি ব্রহ্মোস-এনজি (BrahMos-NG) সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, স্যান্ট (SANT) ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, এবং রুদ্রম (Rudram) অ্যান্টি-রেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্র।

AMCA প্রকল্পের সময়সূচি:

২০২৫-২০২৭: প্রোটোটাইপ নির্মাণ এবং সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন

২০২৮-২০২৯: প্রথম উড়ান এবং প্রাথমিক পরীক্ষা

২০৩০-২০৩৪: ট্রায়াল এবং সার্টিফিকেশন

২০৩৫ এবং তার পরে: উৎপাদন শুরু এবং বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি

প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এই প্রকল্পে HAL-এর পাশাপাশি TATA অ্যাডভান্সড সিস্টেমস, আদানি ডিফেন্স, L&T, ভারত ফোর্জ এবং গুডলাক ইন্ডিয়ার মতো বেসরকারি সংস্থাগুলিকে যুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছে, যা উৎপাদনের গতি ও মান বাড়াবে।

AMCA কেবল একটি যুদ্ধবিমান নয়, এটি ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষার দিকে একটি বিশাল উল্লম্ফন। ২০২৩ সালে প্রথম AMCA যুদ্ধবিমান আইএএফ-এর হাতে আসা ভারতের প্রতিরক্ষা ইতিহাসে এক নির্ণায়ক মুহূর্ত হবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy