১৮৩১ সালে শুরু, আজও বলিপ্রথা নেই! দুর্গা পূজার সঙ্গে কেন কালী পূজা করেন চক্রবর্তী পরিবার? পড়ুন অদ্ভূত ঐতিহ্য!

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর ব্লকের হরিবাসর পাড়া এলাকায় অবস্থিত চক্রবর্তী বাড়ির পুজো কেবল প্রাচীন নয়, এক আশ্চর্য ঐতিহ্যের ধারক। এ বছর ১৯৪তম বর্ষে পা রাখা এই পুজোটি জেলার অন্যতম প্রাচীন এবং ব্যতিক্রমী উৎসব হিসেবে পরিচিত। কারণ, এখানে ষষ্ঠী থেকে দশমী—দুর্গাপূজার পাঁচ দিন দুর্গার সঙ্গে একই মন্দিরের দুটি আলাদা আসনে পূজিত হন মা কালী (দক্ষিণা কালী)।

১৮৩১ সালে দুই দেবীর এক পুজো!

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৮৩১ সালে মধুসূদন চক্রবর্তী প্রথম এই পুজোর সূচনা করেন। হরিরামপুরবাসীর মঙ্গল কামনায় এবং নানা ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে তিনি একসঙ্গে দুর্গা ও কালী পুজোর প্রচলন করেন। সেই সময় প্রায় ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে আর কোথাও দুর্গাপূজা হতো না। ফলস্বরূপ, হরিরামপুর, বংশীহারী-সহ একাধিক গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসতেন এই পুজো দেখতে। সেই সময় অষ্টমী তিথিতে মনসা গানের আসর বসলেও, বর্তমানে তা বন্ধ। তবে বেটনা গ্রামের এই পুজো আজও তার ‘ঠাকুর বাড়ির পুজো’ খ্যাতি ধরে রেখে প্রথম দিন থেকেই সর্বজনীন রূপ নেয়।

কেন দুর্গার সঙ্গে কালীর আরাধনা?

এই প্রশ্নের সঠিক কারণ পরিবারের বর্তমান সদস্যরাও নিশ্চিত নন। তবে চক্রবর্তী বাড়ির সদস্য গৌতম চক্রবর্তী বলেন, “সব থেকে প্রাচীন পুজো বলতে বোঝায় আমাদের চক্রবর্তী বাড়ির পুজো। দুর্গার সঙ্গে এখানে পূজিত হন মা দক্ষিণা কালী। যদিও এর সঠিক কারণ জানা নেই, তবে ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত দুর্গাপুজোর পরে রোজ কালীপুজো করা হয়।”

অন্যান্য আকর্ষণীয় দিক:

ভোগের বিশেষত্ব: সপ্তমী তিথিতে খিচুড়ি, অষ্টমীতে লুচি-পায়েস এবং নবমীতে অন্নভোগ দেওয়া হয়।

বলিপ্রথা নেই: চক্রবর্তী বাড়ির এই ঐতিহ্যবাহী পুজোতে বলি প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

বারো মাস নিত্যপুজো: পুজোর শেষে দুর্গা ও কালী প্রতিমা নিরঞ্জন হলেও, সারা বছর এই মন্দিরে নিত্যপুজো চলতে থাকে। মন্দিরের একপাশে মা মনসার থানও রয়েছে, যেখানে দুর্গাপূজার সময় ভোগ নিবেদন করা হয়।

পরিবারের মিলনক্ষেত্র: মূল উদ্যোক্তা অরুণাভ চক্রবর্তী জানান, পরিবারের সদস্যরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকলেও পুজোর এই কটাদিন তাঁরা সকলেই একত্রিত হন। বাড়ির প্রসাদ ছাড়া অন্য রান্না বন্ধ থাকে।

বহু বছর ধরে চক্রবর্তী বাড়ির ছেলেরাই এই পুজোর আয়োজন করে আসছেন। মৃৎশিল্পী সুব্রত পাল প্রায় ২৫ বছর ধরে দুর্গা ও কালী, দুই দেবীর প্রতিমাই তৈরি করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা শান্তনু দাস-সহ পাড়ার লোকজনের কাছে এই পুজো কেবল উৎসব নয়, “ঠাকুর বাড়ির পুজো” হিসেবে এক আবেগের নাম।