“কন্যা সম্প্রদান মানে অধিকার ধ্বংস”-বিয়েতে গোত্রান্তর কেন হবে? সুপ্রিম পর্যবেক্ষণে আইন বদলের ঝড়

বিয়ের পর কন্যা সম্প্রদানের মাধ্যমে মেয়েদের গোত্রান্তরের হাজার হাজার বছরের পুরোনো ধর্মীয় রীতির আইনি প্রভাব নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণের পর দেশজুড়ে চরম বিতর্ক শুরু হয়েছে। শীর্ষ আদালতের মন্তব্যের পর কেউ তুলছেন আইন বদলের দাবি, কেউবা আজকের দিনে এই পশ্চাদপদতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এমনকি কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে ‘সতীদাহ প্রথা’ ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মহিলা বিচারপতি বি ভি নাগরত্নার একটি পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, গোত্রান্তরিত নারীর নিজস্ব উপার্জিত সম্পদ বা যৌতুক হিসেবে পাওয়া স্ত্রীধনে তাঁর মৃত্যুর পর শুধু স্বামীর পরিবারেরই অধিকার থাকবে।

এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে: হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, একটি স্বাবলম্বী মেয়ের উপার্জিত সম্পত্তিতে কি সত্যিই বাপের বাড়ির কোনো অধিকার থাকবে না?

পুরাণ বিশেষজ্ঞ থেকে পুরোহিত: কঠোর সমালোচনা
সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণের কঠোর সমালোচনা করেছেন সমাজের নানা স্তরের মানুষ।

পুরাণ বিশেষজ্ঞ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী গোত্রান্তর প্রথার আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর কথায়, “কন্যা সম্প্রদানের অর্থ হলো পিতা কন্যার উপরে তার নিজের স্বত্ত্ব বা অধিকার ধ্বংস করে তা আর একজনকে দান করছেন।” তিনি স্পষ্ট করেন, গোত্রান্তর ছিল সেকালের রেজিস্ট্রেশন এবং স্ত্রীধনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, স্ত্রীধনে তো তার স্বামীরই অধিকার নেই, সেখানে স্বামীর পরিবারের অধিকারের প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?

সমাজতত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায় এর সঙ্গে সতীদাহ প্রথার যোগসূত্র টেনেছেন। তিনি বলেন, “সতীদাহ প্রথা তো শুরুই হয়েছিল হিন্দু বিধবার সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য। আইনে যদি এমন ধারা থেকে থাকে, সেটার বদল হওয়া দরকার।”

মহিলা পুরোহিত রোহিণী ধর্মপাল এবং নন্দিনী ভৌমিক আইন বদলের দাবি জানিয়েছেন। রোহিণী ধর্মপালের বক্তব্য, অতীতে নিঃসন্তান বিধবার সম্পত্তি রাজা অধিগ্রহণ করত, সেই নিয়ম এখন নেই। আজকের দিনে মেয়েরা স্বাবলম্বী, তাই তাদের উপার্জিত সম্পত্তিতে শুধু স্বামীর পরিবারের অধিকার থাকা উচিত নয়। নন্দিনী ভৌমিক মনে করিয়ে দেন, অতীতে গোত্রের বন্ধন তৈরি করা হতো স্বামীকে আপন করে নেওয়ার জন্য, আজকের দিনে তার আর কোনো ভিত্তি নেই।

মহিলা বিচারপতির মনোভাবে হতাশা
বিচারবিভাগে এমনিতেই মহিলাদের সংখ্যা কম। অনেকে মনে করেন, নারীদের সংখ্যা বাড়লে আইনের ধারাগুলি আরও বেশি মেয়েদের পক্ষে সহনীয় হয়ে উঠবে। সেখানে এমন একটি নারীবিরোধী আইনের ধারা প্রসঙ্গে একজন মহিলা বিচারপতির এমন মনোভাবে অনেকেই হতাশা গোপন করতে পারেননি।

এই মামলার সূত্র ধরেই আদালতে আইন বদলের দাবি তুলেছেন আইনজীবীরা। তবে প্রশ্ন উঠেছে, আইন বদল করলেই কি হাজার হাজার বছর ধরে সমাজে শিকড় গেড়ে থাকা এই ‘গোত্রান্তরের ভাবনা’ এবং ‘স্ত্রীধনে অধিকার’-এর’ ধারণার বদল ঘটবে? দেশের বিচার বিভাগ ও সমাজব্যবস্থায় এই বিতর্ক আগামী দিনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।