“১০ বছরে ১২ লক্ষ কোটি ঋণ ‘মকুব’!”-প্রশ্ন উঠছে সরকারি ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ প্রশ্নের উত্তরে উঠে এল এক চমকে দেওয়ার মতো পরিসংখ্যান। গত ১০ বছরে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত ব্যাঙ্কগুলি প্রায় ১২ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ মকুব করেছে। রাজ্যসভায় এই তথ্য দিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী।

কাদের জন্য এই ঋণ মকুব?
২২০ জুলাই রাজ্যসভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে ঋতব্রতের প্রশ্ন ছিল—গত ১০ বছরে কোন কোন সরকারি ব্যাঙ্ক কত টাকা ঋণ মকুব করেছে, এবং কেন এই ঋণ মকুব করা হয়েছে? উত্তরে অর্থ প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষ থেকে ২০২৪-২৫-এর মার্চ পর্যন্ত মোট ১২,০৮,৮২৮ কোটি টাকা অনুৎপাদক ঋণ বা এনপিএ মকুব করেছে পাবলিক সেক্টর ব্যাঙ্কগুলি। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঋণগ্রহীতারা দায়মুক্ত হয়ে গিয়েছেন।

কেন মকুব করা হয় ঋণ?
মন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, ব্যাঙ্কের বইয়ে অনাদায়ী ঋণ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকলে সেটিকে রাইট-অফ বা হিসেব থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে ঋণের দায় শূন্য দেখানো গেলেও, আদায়ের প্রক্রিয়া আইনত চালু থাকে। অর্থাৎ ঋণগ্রহীতাদের উপর থেকে দায় সরে যায় না। ব্যাঙ্কগুলি বিভিন্ন ট্রাইবুনাল, আদালত ও ইনসোলভেন্সি কোডের (IBC) মাধ্যমে সেই অর্থ আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যায়।

আর্থিক স্বাস্থ্য সুন্দর দেখানোর কৌশল?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ মকুব মূলত একটি হিসেবনিকেশের কৌশল। দীর্ঘমেয়াদে অনাদায়ী ঋণ ব্যাঙ্কের ব্যালান্স শিটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই ঝুঁকি এড়াতে রাইট-অফ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে এনপিএ-এর হার কমে এবং ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বাস্থ্য তুলনামূলক ভালো দেখায়। তবে, আদায় না হলে শেষপর্যন্ত সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের উপরেই চাপ পড়ে।

বিরোধীদের প্রশ্নবাণ
এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়েছেন বিরোধীরা। তৃণমূল সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সরকার সাধারণ মানুষের উপর করের বোঝা চাপায়, অথচ কর্পোরেট বা বড় ঋণগ্রহীতাদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ মকুব করে দেয়। এটা আর্থিক বৈষম্যের এক ভয়ঙ্কর চিত্র।”

এখন প্রশ্ন — কারা পেল এই সুবিধা?
এত বিপুল ঋণ রাইট-অফ করা হলেও, এখনও পর্যন্ত কারা সেই ঋণগ্রহীতা ছিলেন, তার নির্দিষ্ট তালিকা সরকার প্রকাশ করেনি। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, “পাবলিক মানি” যেখানে জড়িত, সেখানে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। ঋণ মকুব হলেও জনগণ জানুক কাদের ঋণ শোধ হয়নি।”

২০২৬-এর নির্বাচনের প্রাকমুহূর্তে এই পরিসংখ্যান যে বিরোধীদের হাতে বড় অস্ত্র হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার, কেন্দ্রীয় সরকার স্বচ্ছতার পথে হাঁটে, না কি বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়।