বিজেপি কর্মী হত্যা মামলা! তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ, ফের রিপোর্ট তলব আদালতের

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসায় কাঁকুড়গাছির বিজেপি কর্মী অভিজিৎ সরকারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবারও উত্তাপ ছড়াল কলকাতা হাইকোর্টে। মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইকে এবার সরাসরি দুই পুলিশ কর্মীর গ্রেফতারি সংক্রান্ত ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে রিপোর্ট তলব করল আদালত। এই নির্দেশ বিচার প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, একইসাথে নিহত অভিজিতের পরিবারের দীর্ঘ বিচার প্রার্থনার পথকেও আলোকিত করেছে।
ঘটনার চার বছর পরেও অভিজিৎ সরকারের মৃত্যু রহস্যের জট সম্পূর্ণ খোলেনি। ২০২১ সালের ২ মে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন, অভিজিৎ সরকারের বাড়ি থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে মারধর করে এবং গলায় তার পেঁচিয়ে খুন করা হয়েছে। মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেই অভিজিৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর বাড়িতে আক্রমণ চালানো হচ্ছে এবং তাঁর পোষ্যদেরও আক্রমণ করা হচ্ছে।
পুলিশি তদন্তে অসন্তোষ ও সিবিআইয়ের প্রবেশ:
শুরুতে নারকেলডাঙ্গা থানা এই ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও, পুলিশের তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় অভিজিতের পরিবার। আদালতের নির্দেশে এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিবিআই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সম্প্রতি সিবিআই এই মামলায় একটি অতিরিক্ত চার্জশিট জমা দেয়, যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। সেই চার্জশিটে বেলেঘাটার বিধায়ক পরেশ পাল, কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার এবং কাউন্সিলর পাপিয়া ঘোষের নাম ছিল বলে জানা গেছে, যা মামলার রাজনৈতিক প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
পুলিশ কর্মীদের গ্রেফতারি ও আদালতের ভর্ৎসনা:
সিবিআইয়ের অতিরিক্ত চার্জশিটে নারকেলডাঙ্গা থানার তৎকালীন ওসি শুভজিৎ সেন, সাব-ইনস্পেক্টর রত্না সরকার এবং হোমগার্ড দীপঙ্কর দেবনাথের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়। গত ১৮ জুলাই নিম্ন আদালত তিনজনকেই ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দেয়।
গত সোমবার রত্না সরকার এবং দীপঙ্কর দেবনাথ জামিনের আবেদন নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। মঙ্গলবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ তাঁদের গ্রেফতারির ঘটনায় সিবিআইয়ের কাছে রিপোর্ট তলব করেন। সিবিআইয়ের আইনজীবী আদালতে ৭ দিন সময় চাইলে, রাজ্যের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি সওয়ালে বলেন, “এই ঘটনায় চার বছর পর সিবিআই হঠাৎ অতিরিক্ত চার্জশিট দিয়েছে। পুলিশ কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন তাঁদের হেফাজতে রাখতে সময় চাওয়া হচ্ছে।”
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত সিবিআইকে আগামী চার দিনের মধ্যে অর্থাৎ শুক্রবারের মধ্যে এই বিষয়ে হাইকোর্টে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী শুক্রবারই এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। বর্তমানে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মীরা জেলেই বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
এই ঘটনা একদিকে যেমন বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা তুলে ধরছে, তেমনি ভোট পরবর্তী হিংসার মতো স্পর্শকাতর মামলায় পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্বকেও সামনে আনছে। নিহত অভিজিৎ সরকারের পরিবার চার বছর ধরে যে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন, এই নতুন মোড় সেই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করবে নাকি দ্রুত সমাধানের পথ দেখাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।