নীরব ঘাতক ফ্যাটি লিভার, সচেতনতা বাড়াতে হবে এখনই!

দেশে দিন দিন ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অথচ এই কঠিন রোগটি নিয়ে জনসচেতনতা অত্যন্ত কম। লিভারে স্বাভাবিকভাবেই কিছু স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে, কিন্তু এর চেয়ে বেশি পরিমাণে চর্বি জমতে শুরু করলে লিভার তার কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে, যার ফলে শরীরে বিভিন্ন মারাত্মক লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।

ফ্যাটি লিভারের লক্ষণগুলো কী কী?
ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব স্পষ্ট থাকে না, তাই অনেকে এটিকে গুরুত্ব দেন না। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন:

পেট ভার হয়ে যাওয়া: বিশেষ করে খাবার পর পেট ভারী লাগা।
হজমের সমস্যা: বদহজম, গ্যাস বা অ্যাসিডিটির মতো সমস্যা।
বমিবমি ভাব: প্রায়শই বমি বমি লাগা বা বমি হওয়া।
প্রথমদিকে তেমন পেটে ব্যথা থাকে না, তবে রোগ বাড়লে পেটে অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার কেন হয়?
শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক এবং পরিপাকতন্ত্র ও লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ফারুক আহমেদ জানান, ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণগুলো হলো:

অতিরিক্ত ওজন: স্থূলতা ফ্যাটি লিভারের অন্যতম প্রধান কারণ।
ডায়াবেটিস: অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়।
উচ্চ কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ: এই দুটি সমস্যাও ফ্যাটি লিভারের কারণ হতে পারে।
অ্যালকোহল: পশ্চিমা সমাজে লিভারে চর্বি জমার প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন।
বিভিন্ন ওষুধ সেবন: কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনের কারণেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে।
অন্যান্য রোগ: কিছু সুপ্ত রোগের কারণেও লিভারে চর্বি জমতে পারে।
আশ্চর্যজনকভাবে, কম ওজনের মানুষেরও ফ্যাটি লিভার হতে পারে, যাকে লিন ফ্যাটি লিভার বলা হয়।
ডা. ফারুক আহমেদ আরও জানান, লিভারে চর্বি জমার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। বর্তমানে বাচ্চাদের মধ্যেও এই রোগের হার প্রায় ১৫ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই যেসব বাচ্চার ওজন বেশি, তাদের প্রতি বিশেষ সতর্ক থাকতে হবে।

নীরব ঘাতক: রোগ নির্ণয় ও অগ্রগতির লক্ষণ
ফ্যাটি লিভারকে অনেকটাই নীরব ঘাতক বলা হয়। কারণ, প্রথম দিকে কেউই এ সমস্যার কথা জানতে পারেন না। রুটিন আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে গিয়েই এটি প্রায়শই ধরা পড়ে।

শুরুর দিকে লিভারের চারপাশে কিছু চর্বি জমা হয়, তখন সাধারণত অন্য কোনো লক্ষণ থাকে না। এরপর ধীরে ধীরে সেখানে প্রদাহ (inflammation) শুরু হয়। এই পর্যায়ে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শরীরে শক্তি কমে যায় ও দুর্বল অনুভব হয়। ক্ষুধা কমে যায়, জন্ডিস হতে পারে, এমনকি শরীরের বিভিন্ন অংশ, চোখ, মুখ এবং হাত হলুদ হয়ে যেতে পারে।

ডা. ফারুক আহমেদ সতর্ক করে বলেন, “এই অবস্থা দীর্ঘদিন চললে হাত-পায়ে জল জমতে পারে। অনেক সময় রক্ত বমিও হয়। এরপরও যদি সঠিক চিকিৎসা না করানো হয়, তবে সেটি লিভার ক্যানসারে পরিণত হতে পারে।”

প্রতিরোধে করণীয়: জীবনযাত্রায় পরিবর্তনই মূল চাবিকাঠি
ফ্যাটি লিভারের সমস্যা প্রতিরোধে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। এজন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা:

পুষ্টিকর খাবার: জাঙ্ক ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার পরিহার করে শাকসবজি, ফলমূল এবং স্বাস্থ্যকর প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা: নিয়মিত ব্যায়াম এবং সুষম খাদ্যের মাধ্যমে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
পরিমিত ঘুম: পর্যাপ্ত ঘুম লিভারের সুস্থ কার্যকারিতার জন্য অপরিহার্য।
নিয়মিত শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের শরীরচর্চা করুন।