ঘরের কোণে অযত্নে বেড়ে ওঠা গাছও হতে পারে মহৌষধ! জানুন ভেষজের ভাণ্ডার

প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের আশেপাশে থাকা বহু গাছপালা ও তরুলতা নানা ওষধি কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি ওষুধের ভিত্তিই হল এই ভেষজ উদ্ভিদরাজি।
গবেষকরা বলছেন, আমাদের চারপাশেই এমন অনেক গাছ রয়েছে যাদের অসাধারণ ওষধি গুণাগুণ বিদ্যমান। গ্রামাঞ্চলের মানুষ বংশ পরম্পরায় এই জ্ঞান বহন করে চললেও, আধুনিক গবেষণায়ও এদের বহুবিধ উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘পৃথিবীজুড়ে ৫০ হাজারের ওপর এমন গাছ ও উদ্ভিদ রয়েছে, যা মানুষ নানা কাজে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করে। দেশেও এরকম প্রায় ১৫০০ প্রজাতির তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৮০০ প্রজাতির গাছ ও উদ্ভিদের ওষধি ক্ষমতার প্রমাণ আমরা পেয়েছি।’
আশ্চর্য্যের বিষয় হল, এর অনেক গাছই আমাদের বাড়ির আশেপাশে অযত্নে, অবহেলায় বেড়ে ওঠে। অথচ সংরক্ষণের অভাবে অনেক মূল্যবান গাছ ও উদ্ভিদ আজ বিলুপ্তির পথে।
বহুকাল ধরে গ্রামে-গঞ্জের মানুষ ওষুধ হিসেবে যেসব গাছপালা ব্যবহার করে আসছেন, তা নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন ড. তাহমিনা হক। তিনি ৪৬৭ জনের উপর সমীক্ষা চালিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, সেখানকার মানুষ অন্তত ২৪৭টি উদ্ভিদ নানা ধরণের ওষধি কাজে ব্যবহার করে। বিশেষ করে ৭৩টির মতো শারীরিক সমস্যায় তারা এসব গাছের নিয়মিত ব্যবহার করেন। সব মিলিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি, এসব গাছপাতার ৪৮৫ ধরণের কাজে ব্যবহার করা হয়।’
তিনি আরও জানান, এই গাছগুলির অনেকগুলির গুণাগুণের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। আবার কিছু উদ্ভিদের উপকারিতা গবেষণায় এখনও প্রমাণিত না হলেও, ব্যবহারকারীরা সেগুলো ব্যবহার করে উপকার পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
ড. হক গ্রামেগঞ্জে ওষধি হিসেবে যেসব গাছপালা, উদ্ভিদ বা তরুলতার ব্যবহার দেখতে পেয়েছেন, সেরকম কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো:
১. মেন্দা: পেটের পীড়া ও রক্ত-আমাশায় কার্যকর। ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও লড়তে পারে। ভাঙা হাড় জোড়া লাগাতেও এর ব্যবহার ছিল।
২. বনধনে: পেটের ব্যথা ও ডায়রিয়ার ওষুধ এবং ঘা-পাঁচড়ার চিকিৎসায় কাজে লাগে।
৩. ভাট ফুল বা বনজুঁই: কৃমিনাশক ও ডায়রিয়ার জন্য উপকারী। চর্মরোগেও এর রস মালিশে উপকার পাওয়া যায়।
৪. নিম: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, চিকেন পক্স ও চামড়ার অ্যালার্জির চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত। পোকা মাকড়ের কামড়ের ক্ষত এবং দাঁতের ব্যথায়ও এর ব্যবহার রয়েছে।
৫. তুলসী: সর্দি-কাশিতে অত্যন্ত পরিচিত। মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়াতেও এর ভূমিকা আছে বলে মনে করা হয়।
৬. চিরতা (কালমেঘ): ডায়াবেটিস, পেট খারাপ, ডায়রিয়া, জ্বর ও বাত ব্যথায় উপকার দেয়।
৭. পাথরকুচি: কিডনির পাথর ভাঙতে সাহায্য করে বলে ধারণা প্রচলিত, যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জ্বর ও পেট ফাঁপায় ব্যবহারকারীরা উপকার পেয়েছেন। চামড়ার অ্যালার্জিতেও এটি ব্যবহৃত হয়।
৮. তকমা: হজমশক্তি বাড়ায় ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
৯. কেশরাজ বা কালোকেশী: চুলের যত্নে বহুকাল ধরে ব্যবহৃত। চুল পড়া বন্ধ করতে সহায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। মেয়েদের মাসিকের সমস্যাতেও এর ব্যবহার রয়েছে।
১০. বাসক: ঠাণ্ডা ও ফুসফুসের নানা সমস্যায় ব্যবহৃত। শ্বাসনালীর সমস্যাতেও এর উপকারিতা দেখা গেছে।
১১. অর্জুন: হৃদরোগ, বুকে ব্যথা, যৌন দুর্বলতা এবং হাড়ের সমস্যায় ব্যবহৃত হয়।
১২. রিফিউজি লতা: কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ করতে সাহায্য করে।
১৩. জবা: পেট খারাপ ও জন্ডিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। মেয়েদের মাসিক ও স্রাবজনিত সমস্যাতেও এর ব্যবহার আছে।
১৪. লজ্জাবতী: ডায়রিয়া, ঘা-পাঁচড়া ও বাতের ব্যথায় কাজে লাগে।
১৫. দূর্বা ঘাস: রক্তক্ষরণ, আঘাতজনিত ক্ষত ও চর্মরোগে উপকারী। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ।
১৬. ধুতুরা: অ্যাজমার উপশমে পূর্বে ব্যবহৃত হত, তবে বর্তমানে এটি বিলুপ্তির পথে।
১৭. থানকুনি: পেটের রোগ, হজম শক্তি বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, চুল পড়া কমানো ও ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে সহায়ক।
১৮. স্বর্ণলতা: জন্ডিস নিরাময়, তলপেটের ব্যথা কমানো ও ক্ষত উপশমে ব্যবহৃত হয়। তবে গর্ভপাত বা প্রজনন ক্ষমতা কমাতে পারে বলেও ধারণা আছে।
১৯. শতমূলী: বন্ধ্যাত্ব নিরাময় ও শক্তিবর্ধক হিসাবে কাজ করে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে।
২০. বিলিম্বি: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রমাণিত। চুলকানি, মাম্পস ও যৌনরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।
২১. সাজনা: উচ্চ রক্তচাপ ও লিভারের বিভিন্ন ওষুধে ব্যবহৃত হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণেও সাহায্য করে বলে মনে করা হয়। বাতের ব্যথায়ও এর ব্যবহার আছে। এটি পুষ্টিকর এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
এছাড়াও আমলকি, হরিতকী ও বহেরার মতো ফলগুলোও বহুকাল ধরে ওষধি হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রকৃতির এই ভাণ্ডার আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আজও এক অমূল্য সম্পদ। প্রয়োজন শুধু এদের সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জ্ঞান রাখা।