গ্যাস্ট্রিকের কষ্ট? অবহেলা করবেন না, হতে পারে পেটের ক্যান্সারের পূর্বাভাস!

অনিয়মিত জীবনযাপন শরীরে ডেকে আনছে নানা সমস্যা। বেহিসেবি খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মশলাদার, মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাবার গ্রহণের ফলে বাড়ছে গ্যাস্ট্রিকের প্রকোপ। শুধু খাদ্যাভ্যাস নয়, দুশ্চিন্তা, শরীরচর্চার অভাব বা অতিরিক্ত মদ্যপানও অ্যাসিডিটির কারণ হতে পারে। তবে সামান্য বুক বা পেট জ্বালাপোড়া করলেই মুঠো মুঠো ওষুধ খেয়ে সাময়িক আরাম খোঁজেন অনেকে। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদী বিপদ আরও বাড়তে পারে।
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও, ঘন ঘন এতে ভোগা মোটেও হেলাফেলা করার মতো নয়। কারণ গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বিভিন্ন ধরনের পেটের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। এমনকি এই ক্যান্সার একসময় লিভার, ফুসফুস এবং হাড়ের মধ্যেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের প্রায় ৯৫ শতাংশ ধরণই শুরু হয় পেটের ভেতরের কোষগুলোর উপর শ্লেষ্মা তৈরির মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে ঘায়ে রূপান্তরিত হয়। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পাচনতন্ত্রে। ধীরে ধীরে এটি কার্সিনয়েড টিউমার, গ্যাস্ট্রিক সারকোমা এবং লিম্ফোমাস-এও রূপ নিতে পারে।
কাদের ঝুঁকি বেশি?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ২৮ হাজার মানুষ গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। নারীদের তুলনায় পুরুষরা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। একসময় যুক্তরাষ্ট্রে ক্যান্সারের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এটি, তবে বর্তমানে এটি ক্যান্সারের তালিকায় ১৪তম সাধারণ ক্যান্সার।
গবেষকরা মনে করেন, রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষিত ফল ও শাকসবজি কম খাওয়া এবং ধূমপান ও অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার গ্রহণ এর অন্যতম কারণ। তাদের মতে, হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া পেটে আলসার ও প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং এটি গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে এর বিভিন্ন ধরণের মধ্যে কিছুতে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শে এই ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করানো যেতে পারে। ১৯৩০ সালের পর অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার মাধ্যমে পাইলোরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হওয়ায় গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের হার অনেকটাই কমেছে।
এছাড়াও, বংশগত কারণ এবং পেটে অস্ত্রোপচার হলেও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। আগে থেকে রক্তস্বল্পতা, কোলনের সমস্যা বা হজমের সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে থাকেন।
নিয়মিত ধূমপান, অতিরিক্ত লবণাক্ত মাছ-মাংস, ক্যানের আচার, সবজি এবং প্রচুর অ্যালকোহল পান করার মতো দৈনন্দিন অভ্যাসও গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের লক্ষণসমূহ:
অনেকের ক্ষেত্রে শরীরে এই রোগ বাসা বাঁধলেও কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তবে বেশিরভাগ সময়ে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন:
ক্লান্তি অনুভব করা
অল্প খেলেই পেট ফুলে যাওয়া
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পরেও ক্ষুধা না লাগা
বদহজম
পেট ব্যথার সাথে অম্বল
বমি বমি ভাব এবং বমি হওয়া
ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
অকারণে ওজন হ্রাস
রক্তাক্ত বা কালো মল
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। রোগ নির্ণয়ের জন্য শুরুতে এন্ডোস্কোপি করার প্রয়োজন হতে পারে, যেখানে একটি ছোট ক্যামেরা টিউবের মাধ্যমে গলা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে পেটের ভেতরের অংশ দেখা হয়। প্রয়োজনে বায়োপসির জন্য পেটের ভেতরের টিস্যু সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানো হয়, যেখানে মাইক্রোস্কোপের নিচে ক্যান্সার কোষের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। এছাড়াও সিটি স্ক্যান, বিভিন্ন কোণ থেকে পেটের এক্স-রে এবং এমআরআই-এর মতো আরও কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে।
রোগ শনাক্ত হওয়ার পর সাধারণত সার্জারি করার প্রয়োজন হয়। অনেক সময় রেডিয়েশন থেরাপি বা কেমোথেরাপির মাধ্যমেও ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা যেতে পারে। এই দুটি থেরাপি প্রায়শই একসাথে ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে, ক্যান্সারে আক্রান্ত কোষের আশেপাশের কোষেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে, তখন ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হতে পারে, যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে এবং নতুন ক্যান্সার কোষ মেরে ফেলে। সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং সুস্থ থাকুন।