গত দশ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে ওবেসিটি আক্রান্তের সংখ্যা, উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

২০১৫-২০১৬ সালের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS)-এর সমীক্ষার তথ্য অনুসারে, গত এক দশকে ভারতে ওবেসিটি বা স্থূলতা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০৫-২০০৬ সালের তুলনায় এই বৃদ্ধি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই সমীক্ষায় ভারতের প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। ফলাফলে দেখা গেছে, শুধুমাত্র দিল্লি বা গোয়ার মতো উন্নত রাজ্যই নয়, সিকিম এবং হিমাচল প্রদেশের মতো পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষও সমানভাবে অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তির উন্নতি এবং কায়িক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাওয়াই এর প্রধান কারণ। নিউট্রিশন ও লাইফস্টাইল ক্লিনিক ‘নিউট্রিয়েন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা হেনা নাফিস এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘গত দশ বছরে পরিস্থিতি যতটা খারাপ হয়েছে, আগামী দশ বছরে তা আরও ভয়াবহ হতে পারে। এই সমস্যার সমাধানে কেবল সাধারণ মানুষ নন, সরকারের পক্ষ থেকেও এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’’
কেন বাড়ছে ওবেসিটি?
অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ অবশ্যই একটি প্রধান সমস্যা। এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. দেবমাল্য সান্যাল এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘যদি আমরা মানব ইতিহাসের একেবারে শুরুর দিকে তাকাই, তাহলে দেখব মানুষের জীবনে কখনোই খাদ্যের প্রাচুর্য ছিল না। আমরা মূলত শিকারী ছিলাম এবং ফলমূল সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করতাম।’’ এরপর কৃষিকাজ শুরু হলেও খাদ্য добы করার জন্য মানুষকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হত এবং প্রতিদিন খাদ্য পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সেই কারণেই শরীর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার মেদ হিসেবে জমা করে রাখত, যাতে ভবিষ্যতে খাদ্যাভাবের সময় কাজে লাগে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে ওজন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এশিয়ার মানুষ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, মাতৃগর্ভে অপুষ্টির শিকার হওয়া শিশুদের শরীরে ফ্যাট জমা করার প্রবণতা বেশি থাকে। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে, তবুও এক দশক আগেও এই মহাদেশের বহু গর্ভবতী মহিলা অপুষ্টিতে ভুগতেন এবং তাদের সন্তানদের ওবেসিটি হওয়ার ঝুঁকি বেশি ছিল।
অন্যান্য গবেষকদের ধারণা, এশিয়ার মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে প্রায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে টিকে থেকেছে, তাই আমাদের শরীর খাদ্যের প্রাচুর্য সহজে গ্রহণ করতে পারে না। হেনা নাফিস আরও যোগ করেন, ‘‘একদিকে এই থ্রিফটি জিনের কারণে পেটের মেদ বৃদ্ধির আশঙ্কা, অন্যদিকে আধুনিক জীবনের স্ট্রেস ও কম পরিশ্রমের মতো সমস্যা তো আছেই। আমাদের মা-ঠাকুমারা ছোটবেলা থেকেই স্নেহ দেখাতে গিয়ে বাচ্চাদের বেশি করে খাওয়ান এবং খেলাধুলার পরিবর্তে পড়াশোনায় বেশি উৎসাহ দেন। এখন আবার আধুনিক জীবনযাত্রার বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে।’’
শহরাঞ্চলে বসবাসকারী বেশিরভাগ পরিবারের আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকায় বেশি পরিমাণে ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এই খাবারগুলিতে প্রচুর পরিমাণে লবণ, চিনি ও ফ্যাট থাকে। এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারেও দশ-বারো টাকার ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চকোলেট বা কেক-চিপসের প্যাকেট শিশুদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ঢুকে পড়ছে।
কিছু ক্ষেত্রে মেদবাহুল্যের সমস্যা বংশগতও হতে পারে। সন্তানেরা যেমন তাদের বাবা-মায়ের চোখের রঙ বা ত্বকের রঙ উত্তরাধিকার সূত্রে পায়, তেমনই অতিরিক্ত ওজনের সমস্যাও আসতে পারে। কিছু জিন শরীরের খাদ্য বিপাক প্রক্রিয়া এবং ফ্যাট ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে। যাদের পরিবারে ওবেসিটির সমস্যা রয়েছে, তাদের শরীরে ফ্যাট বার্ন করার প্রক্রিয়া ধীর গতির হতে পারে। ফলে ওজন দ্রুত বাড়লেও কমাতে বেশি সময় লাগে।
নেফ্রোলজিস্ট ডা. শৈবাল রক্ষিত আরও কয়েকটি কারণের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘ আজকালকার মেয়েরা কেরিয়ার নিয়ে অনেক বেশি সচেতন এবং অনেকেই তিরিশের পরে মা হন। গর্ভধারণ পিছিয়ে দেওয়ার জন্য তারা নিয়মিত গর্ভনিরোধক পিল গ্রহণ করেন, যার কারণেও ওজন বাড়তে পারে। এছাড়াও হরমোনের সমস্যা, হাইপোথাইরয়েডিজম বা কুশিং সিনড্রোম থাকলে অথবা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড খেলেও অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। জেনেটিক বা কনজেনিটাল কিছু সমস্যাও ক্ষেত্রবিশেষে ওজন বৃদ্ধির জন্য দায়ী। এমনকি হাইপোথ্যালামাসে আঘাত বা টিউমার থাকলেও রোগী অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগতে পারেন। দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টি সাইকোটিক বা অ্যান্টি এপিলেপটিক ওষুধ অথবা ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণকারীদেরও ওজন নিয়ে সমস্যা হতে পারে। তাই আমার পরামর্শ, যারা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন, তারা অবশ্যই একবার ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ডাক্তারই বলতে পারবেন ঠিক কী কারণে আপনার ওজন বাড়ছে এবং কীভাবে সেই অতিরিক্ত ওজন কমানো সম্ভব।’’