অ্যানোরেক্সিয়া: যখন খাবারের চাহিদা কমে যায় এবং তা রোগ হয়ে দাঁড়ায়

অ্যানোরেক্সিয়া মূলত খাদ্যাভাসের একটি বিশেষ পর্যায়, যেখানে খাবারের প্রতি মানুষের চাহিদা কমে যায়। সাধারণভাবে, বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে অনেকেরই ক্ষণিকের জন্য খাবারের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে অ্যানোরেক্সিয়া বলা হলেও, অন্যান্য রোগের কারণে সাময়িকভাবে খাবার গ্রহণে অনীহা দেখা দিলে তাকে রোগ হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ, সুস্থ হয়ে ওঠার পর খাবারের চাহিদা আবারও ফিরে আসে। তবে, যদি অ্যানোরেক্সিয়ার কারণে খাবার খেতে স্থায়ী অনীহা সৃষ্টি হয়, তবে তা একটি রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা কী?
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা হলো খাদ্যাভ্যাসজনিত এক প্রকার মানসিক রোগ। এই রোগের প্রধান কারণ হলো রোগীর অস্বাভাবিক চিন্তাভাবনা। তাদের মনে এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে খাবার খেলেই তাদের ওজন বেড়ে যাবে এবং এর ফলে তারা অসুন্দর হয়ে যাবে। এই ধরনের চিন্তাভাবনার কারণে যদি কারো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে, অথবা দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালোরি গ্রহণ থেকে বিরত থাকে বা উপোস করা শুরু করে, তখন সেই অবস্থাকে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা বলা হয়।
এই রোগের কারণ কী?
চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে অ্যানোরেক্সিয়ার বেশ কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
১. বায়োলজিক্যাল কারণ: অ্যানোরেক্সিয়ার কিছু জৈবিক কারণ থাকতে পারে। যেমন, কারো জিনগত সমস্যা থাকলে তার ক্ষুধা কম লাগতে পারে এবং সে খাবার এড়িয়ে চলতে পারে। তবে এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম দেখা যায়।
২. পারিপার্শ্বিক প্রভাব: অনেকেই নিজেদের সুন্দর ও আকর্ষণীয় দেখাতে স্লিম বা ছিপছিপে গড়ন পেতে চান। এই কারণে তারা খাবার কম খান। এর ফলে এক সময় তাদের অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা হতে পারে।
৩. মানসিক কারণ: কেউ কেউ অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) অথবা হতাশা ও বিষণ্ণতার কারণে খাবার গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। তারা নিজেদের স্বাস্থ্যবান মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে খাবার না খেলে তাদের মানসিক চাপ কমবে। এই চিন্তা থেকে তারা খাওয়া বন্ধ করে দেয়, যা ধীরে ধীরে অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসায় রূপ নেয়।
আবার, অনেকেই স্থূলতার কারণে বিভিন্নভাবে বুলিংয়ের শিকার হয়ে থাকেন। এমন ব্যক্তিরা ওজন কমানোর জন্য কম খাওয়া শুরু করেন। দ্রুত ওজন কমানোর জন্য তারা নিজেদের মনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দেয়। দেখা যায়, একসময় তাদের আর ক্ষুধা লাগে না। এভাবে কারো কারো ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ খাবার বন্ধ করে কেবল জল পান করে জীবন ধারণের প্রবণতাও দেখা যায়, যা অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার একটি লক্ষণ।
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসার উপসর্গ
অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা তাদের স্বভাব ও চালচলন অন্যদের থেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। যদিও অনেক শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তন তারা গোপন করতে পারেন না। কিছু সাধারণ উপসর্গ হলো:
১. অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যাওয়া এবং রোগীকে দেখে খুবই অসুস্থ মনে হওয়া।
২. অন্যদের সামনে খেতে না চাওয়া। খেলেও নানা অজুহাতে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা অথবা খুব অল্প পরিমাণে খেয়ে উঠে যাওয়া।
৩. একটা সময় খাবার গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এবং খাবার না খেয়েও ভালো থাকার ভান করা।
৪. শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও নিজেদের রোগ বুঝতে পেরেও চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করা।
৫. খাবার গ্রহণ না করার কারণে সারাক্ষণ মাথা ঘোরা (ভার্টিগো) এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করা।
৬. অকারণে শীত শীত লাগা।
৭. চুল পড়ে যাওয়া।
৮. শরীরের চামড়া শুকিয়ে যাওয়া।
৯. নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুচক্র বা ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।
১০. কিছু আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়, যেমন – খাওয়ার পর অস্বস্তি বোধ করা, বারবার আয়নায় নিজেকে দেখা, ওজন মাপা ইত্যাদি।
১১. মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া। সোশ্যাল অ্যাংজাইটি অথবা ফোবিয়া তৈরি হওয়া।
১৪. ওজন কমানোর জন্য অতিরিক্ত ব্যায়াম করা।
অ্যানোরেক্সিয়ার চিকিৎসা
অ্যানোরেক্সিয়া একটি মানসিক রোগ হলেও এর প্রভাব শরীর ও মন উভয়ের ওপরই পড়ে। তাই এর চিকিৎসাপদ্ধতিও বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। অপুষ্টিতে ভোগার কারণে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজনও হতে পারে। তবে ওজন স্বাভাবিক থাকলে হাসপাতালে ভর্তি না হয়েও চিকিৎসা করানো সম্ভব।
সাধারণত মেডিসিন ও সাইকিয়াট্রিস্ট চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা নিউরোলজিস্টের পরামর্শও লাগতে পারে। চিকিৎসার শুরুতে রোগীর পুষ্টির অভাব পূরণ করা জরুরি। মুখে খাবার খেতে না পারলে শিরার মাধ্যমে সাপ্লিমেন্ট দিয়ে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালোরি সরবরাহ করা যেতে পারে।
এরপর রোগীকে ধীরে ধীরে খাবারের জন্য কাউন্সেলিং করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে তাদের খাদ্যাভ্যাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য তাদের খাবারের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পুষ্টি বিশেষজ্ঞ এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা সাইকোথেরাপিস্টদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
ওজন বেড়ে যাওয়ার যে ভয় রোগীর মধ্যে তৈরি হয়েছে, তা দূর করার জন্য সঠিকভাবে বিহেভিয়ার থেরাপি দেওয়া ও কাউন্সেলিং করা জরুরি। এক্ষেত্রে রোগীর পরিবারের সদস্যদের উৎসাহ, সহপাঠীদের আন্তরিকতা এবং স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আন্তরিক মানসিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেল্ফ কাউন্সেলিং
যদি কেউ বুঝতে পারেন যে তিনি অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্ত, তবে তার উচিত অবিলম্বে পরিবার বা বন্ধুদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করা। সেইসঙ্গে অ্যানোরেক্সিয়া সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা উচিত। সবচেয়ে ভালো হয় একজন ডাক্তার এবং ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী একটি সঠিক জীবনধারা অনুসরণ করা, যাতে একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করা যায়।
চিকিৎসা না করালে যে সব জটিলতা হতে পারে
অ্যানোরেক্সিয়া নার্ভোসা একটি খাদ্যাভ্যাসজনিত জটিল মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগী খাবার গ্রহণ পুরোপুরি ছেড়ে দেয়। তারা মনে করে খাবার খেলে তাদের ওজন বেড়ে যাবে এবং শরীরের গঠন নষ্ট হয়ে যাবে। এভাবে না খেতে খেতে তাদের শরীরে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। যেমন – অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা, হার্টে মাইট্রাল ভালভ প্রলাপ্স, ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা, কিডনির জটিলতা সহ নানাবিধ হরমোনাল সমস্যা হতে পারে। এমনকি রোগীর মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই এক্ষেত্রে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে চিকিৎসা করানো অপরিহার্য।