১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের স্মৃতিতে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস প্রতি বছর ৬ ডিসেম্বরকে ‘সংহতি দিবস’ বা ‘সম্প্রীতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। আর এদিনের শুরুতেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যবাসীর উদ্দেশে সম্প্রীতি ও একতার জোরালো বার্তা দিলেন। তাঁর এই বার্তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যখন রাজ্যে এক সাসপেন্ডেড বিধায়কের বাবরি মসজিদের শিলান্যাস কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা চলছে।
একতাই শক্তি: বাংলার সংস্কৃতিকে হাতিয়ার
শনিবার সকালে এক্স হ্যান্ডেলে একটি দীর্ঘ পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বার্তার শুরুতেই বেছে নিয়েছেন ‘একতাই শক্তি’ শব্দবন্ধটি। তিনি বাংলার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে সামনে এনে লিখেছেন:
“বাংলার মাটি একতার মাটি। এই মাটি রবীন্দ্রনাথের মাটি, নজরুলের মাটি, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের মাটি— এই মাটি কখনও মাথা নত করেনি বিভেদের কাছে, আগামিদিনেও করবে না।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংবেদনশীল এই দিনে মুখ্যমন্ত্রী এই মহান ব্যক্তিত্বদের নাম উল্লেখ করে বাংলার চিরকালীন ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে সামনে আনতে চেয়েছেন এবং বোঝাতে চেয়েছেন যে সর্বধর্ম সমন্বয়ের আদর্শ এই রাজ্যের ডিএনএ-তে মিশে আছে।
বহুত্ববাদ ও সম্প্রীতির স্লোগান
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পোস্টে বাংলার বহুত্ববাদী সমাজের ছবিও তুলে ধরেছেন। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, জৈন, বৌদ্ধ— প্রতিটি সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, “বাংলায় সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে জানে।”
তৃণমূল সুপ্রিমো’র বহুল প্রচারিত স্লোগান— “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”— ফের একবার উঠে এসেছে তাঁর বার্তায়। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, “আনন্দ আমরা ভাগ করে নিই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসব সবার।” রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা চলছে, তখন মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি
তবে মুখ্যমন্ত্রী শুধু শান্তির বাণী শুনিয়েই ক্ষান্ত থাকেননি। সম্প্রীতির বার্তার আড়ালে লুকিয়ে ছিল কড়া রাজনৈতিক হুঁশিয়ারিও। যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। পোস্টে তিনি লেখেন:
“যারা সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বালিয়ে দেশকে ধ্বংস করার খেলায় মেতেছে, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই জারি থাকবে।”
কারও নাম না-করলেও তাঁর নিশানায় যে বিজেপি এবং উগ্র ডানপন্থী সংগঠনগুলি, তা সহজেই অনুমেয়। তিনি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন, বিভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে তাঁর দল আপোসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
মুখ্যমন্ত্রী আজ গান্ধি মূর্তির পাদদেশে ‘সংহতি দিবস’-এর মূল অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সেখানে উপস্থিত থাকবেন সব ধর্মের ধর্মগুরুরাও। সোশাল মিডিয়ায় এই বার্তা দিয়ে তিনি দলের কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের কাছে দিনের এজেন্ডা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে তিনি সকলকে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।