মেদিনীপুরের মাটিতে ব্রিটিশদের মরণঘণ্টা! ৩ বছরে ৩ জেলাশাসক হত্যা—বিপ্লবীদের সেই রক্তঝরা বীরগাথা আজও অমলিন

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মেদিনীপুর জেলা এক জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড। ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দিতে এই জেলার বিপ্লবীরা যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তার নজির ইতিহাসে বিরল। আজ থেকে প্রায় ৯০ বছর আগে, টানা তিন বছর মেদিনীপুরের মাটিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন তিন অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলাশাসক। সেই স্মৃতি আজও বহন করছে শহরের উপকণ্ঠের জীর্ণ সমাধিগুলি।

অত্যাচারী ত্রয়ীর পতন: ইতিহাসের পাতা থেকে

  • ১৯৩১, জেলাশাসক পেডি: হিজলি বন্দিনিবাসে গুলি চালানোর আদেশ দিয়ে কুখ্যাত হয়েছিলেন জেমস পেডি। ভারতীয়দের ওপর তাঁর নির্মম নির্যাতনের বদলা নিতে ১৯৩১ সালের এপ্রিলে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান দুই অকুতোভয় বিপ্লবী— বিমল দাশগুপ্ত এবং জ্যোতিজীবন ঘোষ। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় পেডির।

  • ১৯৩২, জেলাশাসক ডগলাস: পেডির উত্তরসূরি রবার্ট ডগলাসও ছিলেন সমান অত্যাচারী। পেডি হত্যার ঠিক এক বছর পর, ১৯৩২ সালের এপ্রিলে জেলা পরিষদ সভাগৃহে সভা চলাকালীন দুই বাঙালি বিপ্লবী প্রদ্যুৎ ভট্টাচার্য এবং প্রভাংশু পাল গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেন ডগলাসকে।

  • ১৯৩৩, জেলাশাসক বার্জ: পরপর দুই জেলাশাসকের খুনে ব্রিটিশরা তখন আতঙ্কিত। সেই অবস্থায় মেদিনীপুরের দায়িত্ব নেন বার্জ। কিন্তু তাতেও বিপ্লবীদের রোখা যায়নি। ১৯৩৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মেদিনীপুর কলেজ মাঠে ফুটবল খেলা চলাকালীন তাঁকে হত্যা করেন দুই নির্ভীক বিপ্লবী অনাথ বন্ধু পাঁজা এবং মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত

অবহেলিত স্মৃতি ও সংরক্ষণের দাবি: তিন বছরের এই তিন ব্রিটিশ শিকারকে মেদিনীপুর শহরের শেখপুরা এলাকায় গির্জার সামনে সমাধিস্থ করা হয়। সময়ের আবর্তে আজ সেই সমাধিস্থল আগাছায় ঢেকে গিয়েছে। একসময় বিলেত থেকে এই শাসকদের পরিবারের লোকজন আসলেও, বর্তমানে তা বিস্মৃতির অতলে।

গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে, এই তিন ব্রিটিশ শাসকের সমাধি আসলে বাঙালি বিপ্লবীদের বীরত্বের এক জীবন্ত প্রমাণ। প্রশাসনের উচিত এই চত্বরটিকে সংরক্ষণ করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে কীভাবে মেদিনীপুরের দামাল ছেলেরা নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করে ব্রিটিশদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন।

সম্পাদকের নোট: মেদিনীপুর মানেই প্রতিরোধের ইতিহাস। এই মাটি যেমন ক্ষুদিরামের, তেমনই এই মাটি প্রদ্যুৎ-অনাথবন্ধুদের মতো বিপ্লবীদের। তাঁদের আত্মত্যাগ যেন কোনোদিন বিস্মৃত না হয়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy