নবদ্বীপের তেঘড়ি পাড়ার বাসিন্দা শিব শংকর সাঁধুখা আজ শুধু নদিয়া নয়, গোটা দেশের কাছেই এক অনুপ্রেরণা। পেশায় একজন অঙ্কন শিক্ষক হলেও শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি বহুদিনের। দীর্ঘ প্রায় ৩২ বছর ধরে তিনি পেপার ম্যাচি (Paper Mache) বা কাগজের মণ্ড দিয়ে অসাধারণ শিল্পকর্ম তৈরি করে চলেছেন। তাঁর এই নিরলস সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছরের ৯ ডিসেম্বর দিল্লিতে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে তিনি বরণ করে নেন মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় পুরস্কার।
এর আগেও তাঁর ঝুলিতে ন্যাশনাল মেরিট অ্যাওয়ার্ড-সহ একাধিক জেলা ও রাজ্য স্তরের পুরস্কার ছিল। তবে এবছর রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সরাসরি জাতীয় স্তরের পুরস্কার প্রাপ্তি তাঁর শিল্পী জীবনের এক অনন্য মাইলফলক বলেই মনে করছে শিল্প মহল।
পেপার পাল্পে তৈরি শিল্পকর্মের বিশেষত্ব:
শিব শংকর সাঁধুখা যে মাধ্যমে কাজ করেন, তা হলো পেপার পাল্প বা কাগজের মণ্ড। পুরনো, বাতিল কাগজ জল দিয়ে ভিজিয়ে নরম করে তা চিপে কাদার মতো উপাদান তৈরি করা হয়। এরপর তার সঙ্গে আঠা মিশিয়ে যে মাধ্যমটি তৈরি হয়, তা দেখতে মাটির মতো হলেও শুকিয়ে গেলে অত্যন্ত শক্ত হয়। এর বড় সুবিধা হলো, মাটির তুলনায় ওজন অনেক হালকা হওয়ায় বড় আকারের শিল্পকর্ম তৈরি করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
এই কাগজের মণ্ড দিয়েই শিল্পী একের পর এক অনবদ্য শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। দেবদেবী, জীবজন্তু, থালা-বাসন থেকে শুরু করে নান্দনিক মডেল— সবই তাঁর শিল্পীসত্ত্বার পরিচয় বহন করে। এর আগে তিনি বড় আকারের কুমির, চৈতন্যদেব ও বুদ্ধদেবের মূর্তি, গণেশ, অশোক স্তম্ভ, এবং বিভিন্ন বনসাই মডেল তৈরি করেছেন।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মডেল: ‘ইন্ডিয়ান ওয়াটার সেভিং উইম্যান’
তবে যে শিল্পকর্মটির জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কারে নির্বাচিত হয়েছেন, সেটি হলো ‘ইন্ডিয়ান ওয়াটার সেভিং উইম্যান’। জল সংরক্ষণের সামাজিক বার্তা তুলে ধরা এই মডেলটি প্রতিযোগিতায় পাঠানোর পর বিচারকমণ্ডলীর বিশেষ নজর কাড়ে। এর বিষয়বস্তু, ভাবনা ও শিল্পনৈপুণ্যের জন্য ভারত সরকার এটিকে সেরা মডেল হিসেবে বিবেচনা করে।
শিব শংকর বাবু জানান, বর্তমানে তাঁর কাছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি দিল্লি, বেঙ্গালুরুর মতো শহর থেকেও অর্ডার আসছে। তিনি বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পকর্ম বিক্রি করেন। এছাড়াও বাড়ি থেকেই অনলাইন মাধ্যমে পাইকারি ও খুচরো বিক্রি চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রথমে শখের বশে শুরু হলেও আজ এই শিল্পই তাঁর নেশা এবং পেশা দু’টোই হয়ে উঠেছে।