EC-র অন্দরে বেনজির সংঘাত! কেন ব্যবস্থা নেয়নি ক্যাবিনেট সচিবালয়? জানুন বিস্তারিত

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অন্দরের নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও প্রশাসনিক সংঘাত এবার প্রকাশ্যে চলে এলো। তবে কমিশনের এক সিনিয়র আধিকারিকের বিরুদ্ধে দুই নির্বাচন কমিশনারের আনা গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে এখনই কোনও আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করেছে ক্যাবিনেট সচিবালয়। সচিবালয়ের স্পষ্ট বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনাররা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে ওই চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ফলে সেটিকে সমগ্র নির্বাচন কমিশনের তরফে পাঠানো কোনো আনুষ্ঠানিক বা সরকারি চিঠি হিসেবে গণ্য করা যায় না।
সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত কমোডর লোকেশ কে বাত্রার দায়ের করা একটি তথ্য জানার অধিকার (RTI) আইনের জবাবে প্রকাশিত নথি থেকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
ক্যাবিনেট সচিবালয়ের অবস্থান ও সাংবিধানিক বিতর্ক
ক্যাবিনেট সচিবালয় জানিয়েছে, যেহেতু নির্বাচন কমিশনের তরফে কোনো যৌথ বা আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়নি, তাই একক চিঠির ভিত্তিতে পদক্ষেপ করা অনুচিত। এ ধরনের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা স্বাধীন ও সাংবিধানিক সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জানা গিয়েছে, গত ২৯ জুলাই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী ক্যাবিনেট সচিব টি ভি সোমনাথনকে দুটি আলাদা চিঠি পাঠান। চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র ডেপুটি কমিশনার মনীশ গর্গের একতরফা কাজকর্ম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
ক্যাবিনেট সচিবালয় চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার করে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে চিঠির কপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের প্রিন্সিপাল প্রাইভেট সেক্রেটারিকে পাঠানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে মনীশ গর্গকে নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিবেচনার জন্য বিষয়টি নথিবদ্ধও করা হয়েছে।
কাজের দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ ও নিয়মভঙ্গের অভিযোগ
অভিযোগের মূল কারণ ছিল দায়িত্ব বণ্টন। চিঠিতে সান্ধু ও যোশী অভিযোগ করেন, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার (প্রশাসন)-এর লিঙ্ক অফিসার হওয়ার পরেই মনীশ গর্গ অন্য সমস্ত সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার, ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার এবং ডিরেক্টর জেনারেল পর্যায়ের আধিকারিকদের বিভাগীয় দায়িত্ব রদবদল করেন।
দুই নির্বাচন কমিশনারের দাবি:
আলোচনাহীন সিদ্ধান্ত: নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আলোচনা না করেই গর্গ এই রদবদল করেছেন।
অনুরোধ উপেক্ষা: কমিশনের অনুমতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত না নেওয়ার জন্য গর্গকে বারবার মৌখিক ও লিখিতভাবে সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি তা মানেননি।
ফাইল গোপন: কমিশনার যোশী অভিযোগ করেন, তিনি কাজের দায়িত্ব সংক্রান্ত আসল ফাইলটি দেখতে চাইলেও প্রশাসনিক বিভাগ থেকে তাঁকে সেই ফাইল দেওয়া হয়নি।
দুই কমিশনারের মতে, এই পদক্ষেপে এতদিনের প্রচলিত নিয়ম ভাঙা হয়েছে এবং ২০২৩ সালের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের (নিয়োগ ও চাকরির শর্তাবলী) আইনও স্পষ্ট লঙ্ঘন করা হয়েছে।
কমিশনারদের পদক্ষেপ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন
ক্যাবিনেট সচিবালয়ের এই সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী কেন কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান না খুঁজে সরাসরি ক্যাবিনেট সচিবের দ্বারস্থ হলেন?
প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনারের প্রশ্ন: এক সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কমিশনারদের এই আপত্তিগুলি কমিশনের নিজস্ব বৈঠকে আগে উত্থাপিত ও আলোচিত হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতামত: রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদবও এই পদক্ষেপ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুই কমিশনার কেন বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য কমিশনের জরুরি বৈঠক ডাকলেন না? আর সেখানে কাজ না হলে সাংবিধানিক অভিভাবক হিসেবে সরাসরি রাষ্ট্রপতির দ্বারস্থ না হয়ে ক্যাবিনেট সচিবালয়ে ব্যক্তিগত চিঠি পাঠালেন কেন?
সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের ভেতরের এই টানাপোড়েন ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে ঝড় উঠেছে।