“চোরবাগান পুজোয় ১৯ জনের মৃত্যুর আসল রহস্য ফাঁস!”-মণ্ডপের অন্দরে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল?

দুর্গাপুজোর আনন্দ নিমেষেই বিষাদে বদলে যাওয়ার বিরাট বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়েছে তিলোত্তমা কলকাতা। গত ১৭ অক্টোবর চোরবাগানের একটি পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কেন সেদিন এমন বিপত্তি ঘটল? কেনই বা পদপিষ্ট হয়ে এতগুলি তাজা প্রাণ ঝরে গেল? দুর্ঘটনা কি আদতে মণ্ডপের ভিতরেই ঘটেছিল? অবশেষে এই চাঞ্চল্যকর বিষয়গুলি নিয়ে মুখ খুলেছেন তদন্তকারী দল (সিট)-এর প্রধান তথা কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী।

ঘটনার দিন ঠিক যে সময়ে পদপিষ্ট হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল, বৃহস্পতিবার প্রায় একই সময়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিচারপতি সরস্বতী। তাঁর সঙ্গে এ দিন উপস্থিত ছিলেন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিনহা এবং স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) ডিরেক্টর জেনারেল জাভেদ শামিম। ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিট প্রধান জানান, মণ্ডপে আলোর স্বল্পতা ছিল এবং প্রবেশ ও বেরনোর পথ অত্যন্ত সরু করা হয়েছিল। এর ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড় জমলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিলই। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “প্রচুর মানুষ ঢুকলে যে এমন ঘটনা ঘটবে, তা স্পষ্ট।”

এমার্জেন্সি গেট বন্ধ থাকা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য

তদন্তে নেমে একাধিক গুরুতর ত্রুটির সন্ধান পেয়েছে সিট। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জানান, পুলিশ আধিকারিকরা তাঁকে নিশ্চিত করেছেন যে মণ্ডপে একটি আপৎকালীন বা এমার্জেন্সি এক্সিট পথ থাকার কথা থাকলেও, দুর্ঘটনার সময় সেটি পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

এছাড়াও, ঘটনার দিন মাইকে ঘোষণা করা এক ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই ব্যক্তি বৃষ্টির জেরে মণ্ডপ ভেঙে পড়তে পারে বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং দর্শনার্থীদের দ্রুত মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এর পরেই হুড়োহুড়ি শুরু হয়। ইতিমধ্যেই সেই ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ।

দুর্ঘটনা কি মণ্ডপের ভিতরেই ঘটেছিল?

অনেকেরই দাবি ছিল, পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনাটি মণ্ডপের ভিতরেই ঘটেছে। তবে এই দাবি সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছেন অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মণ্ডপের ভিতরে নয়, বরং বেরনোর গেটের ঠিক সামনেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিপুল ভিড়ের কথা মাথায় রাখলে এন্ট্রি ও এক্সিটের জন্য যে জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট ছিল না বলেই মনে করছেন তিনি।

প্রবেশ ও বেরনোর পথ সরু হওয়ার এই বিষয়টি মাথায় রেখে পুলিশ এবং দমকল বিভাগ থেকে কোন পরিস্থিতিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার ভূমিকাও এই তদন্তের আওতার বাইরে থাকছে না।

সিসিটিভি ফুটেজ ও পরবর্তী পদক্ষেপ

তদন্তের স্বার্থে ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক ক্যামেরা বসানো হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শুরু করে উদ্ধারকাজে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবে সিট। তৈরি করা হচ্ছে ঘটনাস্থলের একটি নিখুঁত নকশাও।

তদন্তের কাজে যাতে বিন্দুমাত্র বিঘ্ন না ঘটে, সে কারণে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মণ্ডপটিকে বর্তমান অবস্থাতেই রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। তবে মণ্ডপ কাঠামোর কোনো ক্ষতি না করেই প্রতিমা নিরঞ্জন করা যেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সিট-কে এই ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারপরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।