২২ হাজার মন্দিরের হিসাব থাকবে এক ক্লিকেই! মধ্যপ্রদেশ সরকারের এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে তোলপাড় রাজ্য!

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মন্দির এবং তীর্থস্থানগুলির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আমূল স্বচ্ছতা আনতে এক যুগান্তকারী ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে মধ্যপ্রদেশ সরকার। রাজ্য সরকারের সংস্কৃতি বিভাগের সাম্প্রতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, মধ্যপ্রদেশের প্রায় ২২,০৯৮টি সরকারি মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত মন্দিরের যাবতীয় সম্পত্তি, জমির পরিমাণ, বার্ষিক আয়-ব্যয় এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্ত গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবার একটি সুসংহত অনলাইন ডিজিটাল পোর্টালে প্রকাশ করা হবে। মূলত মন্দিরগুলির প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, দুর্নীতি রোধ করা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ চিরতরে দূর করার লক্ষ্যেই এই মেগা ডিজিটাইজেশন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।

এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো রাজ্যের বিশাল সংখ্যক সরকারি মন্দিরের একটি সুনির্দিষ্ট ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজিটাল ডেটাবেস তৈরি করা। এর আওতায় উজ্জয়িনের বিশ্ববিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দির, ওরছার রামরাজ সরকার মন্দির এবং মাইহারের পবিত্র মা শারদা মন্দিরের মতো রাজ্যের সমস্ত প্রধান ও প্রখ্যাত তীর্থক্ষেত্রগুলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। নতুন এই পোর্টালে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ভক্তরা সংশ্লিষ্ট মন্দিরের সঠিক নাম, সুদীর্ঘ ইতিহাস, বর্তমান পুরোহিতের নাম ও পরিচয়, সমস্ত ধরনের অস্থাবর ও স্থাবর সম্পত্তির বিবরণ, মন্দিরের মালিকানাধীন মোট জমির পরিমাণ এবং তার বর্তমান বাস্তবিক অবস্থার মতো যাবতীয় তথ্য অত্যন্ত সহজে এক ক্লিকেই দেখতে পাবেন। শুধু তাই নয়, প্রতি বছরের মন্দিরের সুনির্দিষ্ট আয় ও ব্যয়ের হিসাবও সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়মিত ডিজিটাইজ করার সুপরিকল্পিত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় ১,৩২০টি সরকারি মন্দিরের ক্ষেত্রে ১০ একরের বেশি নিবন্ধিত বিশাল কৃষি জমিও রয়েছে। এই সমস্ত প্রাচীন মন্দিরগুলির মালিকানাধীন মোট কৃষি জমির পরিমাণ আনুমানিক প্রায় ৪,৫০০ হেক্টর বলে অনুমান করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী এই সমস্ত উর্বর জমি সংশ্লিষ্ট জেলা কালেক্টরদের তত্ত্বাবধানে স্বচ্ছ নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লিজ দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত সমস্ত অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট মন্দিরের সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়। অন্যদিকে, যেসব মন্দিরের জমির পরিমাণ ১০ একরের কম, সেগুলির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্দির পুরোহিতের হাতেই ন্যস্ত থাকবে। এই আধুনিক ডিজিটাল রেকর্ডের ফলে মন্দিরের এই বিশাল পরিমাণ কৃষি জমি ও সম্পত্তি কীভাবে বাণিজ্যিকভাবে বা ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তারও সম্পূর্ণ ও স্বচ্ছ চিত্র সাধারণের সামনে চলে আসবে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে সফল করতে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি পাইলট প্রজেক্ট বা পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে ধাপে ধাপে রূপায়ণ করা শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রথম পর্যায়ে উজ্জয়িনের মোট ২,৫৩৬টি এবং গোয়ালিয়রের ১,১৬৫টি মন্দিরের যাবতীয় তথ্য অনলাইনে নথিভুক্ত করার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। এই পাইলট প্রজেক্টের সফলতা যাচাইয়ের পরই রাজ্যের বাকি সমস্ত জেলা, ব্লক ও তহসিলের অধীনস্থ মন্দিরগুলিকে ক্রমান্বয়ে এই আধুনিক ডিজিটাল ডেটাবেসের মূল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতি নির্ধারণে বিশ্বাস করা হচ্ছে যে, এই সমস্ত ঐতিহাসিক নথি ও সম্পত্তির হিসাব ডিজিটাইজ করার ফলে মন্দিরের মূল্যবান জমিতে বেআইনি দখলদারি, জবরদখল এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদী আইনি বিরোধগুলি খুব সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, মন্দিরগুলির সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ, ঐতিহ্যশালী ভবনগুলির সংস্কার এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে।

রাজ্যের ধর্ম বিষয়ক ও পর্যটন মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র লোধি এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই উচ্চাভিলাষী অনলাইন পোর্টালটি পুরোপুরি চালু হয়ে গেলে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে জানতে পারবেন যে ঠিক কোন কোন মন্দিরগুলি সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনগুলি ব্যক্তিগত বা ট্রাস্টের অধীনে রয়েছে। মন্ত্রী আরও জোরালোভাবে বলেন যে, এই স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থার ফলে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের সন্দেহ ও ক্ষোভ দূর হবে এবং রাজ্যজুড়ে অবস্থিত ঐতিহ্যমণ্ডিত এই মন্দিরগুলির আরও উন্নত, সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মধ্যপ্রদেশ সরকারের এই যুগান্তকারী ডিজিটাল উদ্যোগ দেশের অন্যান্য রাজ্যের কাছেও একটি বড় ও প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা।