“২০১৫-র সেই ভয়াবহ স্মৃতি ফের ইউরোপে!”-স্পেনে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল হাজার হাজার অভিবাসী

‘ভিভা এসপানা’ অর্থাৎ ‘স্পেন দীর্ঘজীবী হোক’—এই স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। হাজার হাজার মানুষ ভোররাতে উত্তাল সমুদ্র সাঁতরে সোজা পৌঁছে গিয়েছেন স্পেনের সীমান্তে। মরক্কো থেকে কাতারে কাতারে অভিবাসী যেভাবে ঢুকে পড়েছে, তাতে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়েছে ইউরোপে। এই বিপজ্জনক অনুপ্রবেশের চেষ্টা করতে গিয়ে সমুদ্রে ডুবে কয়েকশো মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। সাঁতার কেটে স্পেনে ঢোকার সময় অন্তত ১৮ জনের সলিলসমাধির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। সমস্ত বাধা এবং সেনার পাহারাকে উপেক্ষা করে শরণার্থীরা কার্যত দখল করে নিয়েছে স্পেনের সীমান্তবর্তী শহর ‘সেউতা’।

২০১৫ সালের সেই ভয়াবহ শরণার্থী সঙ্কট ফের মাথাচাড়া দিল ইউরোপের মাটিতে। রয়টার্স সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার ভোরে হঠাত্‍ সমুদ্র সৈকতে পিল পিল করে হাজার হাজার মানুষকে উঠতে দেখা যায়। সমুদ্র গর্ভ থেকে উঠে তাঁরা সোজা দৌড়ে ঢুকে পড়েন স্পেনের ভূখণ্ডে। এই বিপুল জনস্রোতকে আটকাতে শেষমেশ বাধ্য হয়ে সেনা নামাতে হয় স্পেন সরকারকে। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমান ও নৌবাহিনীর সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি সমুদ্রে নজরদারির জন্য বিশেষ ডাইভিং টিম নামানো হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনকে ‘শেনজেন’ মুক্ত ভ্রমণ ব্যবস্থার বাইরে রাখার জোরালো দাবি তুলেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত হলেও স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন সেউতা শহরে প্রায় ৪৯ হাজার মানুষ ঢুকে পড়েছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ তরুণ পুরুষ হলেও নারী এবং শিশু-সহ বহু পরিবারও রয়েছে। উপচে পড়া ভিড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রগুলি সম্পূর্ণ ভরে যায়। বাধ্য হয়ে রাস্তায় শত শত মানুষকে রাত কাটাতে দেখা যায়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান রাচিদ সবিহি আক্ষেপের সুরে জানিয়েছেন, “সীমান্ত ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। চারদিকে এখন সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা।”

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেউতা এবং মেলিলা—এই দুটি শহরই অত্যন্ত সংবেদনশীল। শহর দুটি স্পেনের স্বশাসিত অংশ হলেও, মানচিত্র অনুযায়ী এগুলি আফ্রিকা মহাদেশের ভেতরেই অবস্থিত। মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সেউতাই হল ইউরোপের একমাত্র স্থলসীমান্ত, যা সরাসরি আফ্রিকার সঙ্গে যুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই, ইউরোপে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা হাজার হাজার মানুষের কাছে এটি অন্যতম লোভনীয় প্রবেশদ্বার। ১৫৮০ সাল থেকে সেউতা স্পেনের অধীনে থাকলেও মরক্কো এখনও এই অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে। ফলে অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বেশ টানাপোড়েনের।

পুরনো ক্ষত ও ইউরোপের জন্য বার্তা

স্পেন এর আগেও এমন বহু ঘটনার সাক্ষী থেকেছে। ২০২১ সালে মাত্র দু’দিনে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ সেউতায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। ২০২২ সালে মেলিলা সীমান্তে পদপিষ্ট হয়ে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তা সত্ত্বেও উন্নত জীবনযাত্রা, কর্মসংস্থানের খোঁজ এবং দারিদ্র্য-হিংসা থেকে মুক্তির আশায় প্রতি বছরই শত শত মানুষ মরক্কোর উপকূল থেকে সাঁতরে স্পেনে পৌঁছনোর এই মৃত্যুকূপে পা বাড়ান।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ১০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করার পর গোটা মহাদেশজুড়ে অভিবাসন নীতি নিয়ে তুমুল রাজনৈতিক ঝড় উঠেছিল। যার জেরে বহু দেশ কড়া সীমান্ত নীতি গ্রহণ করে এবং কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটে। বর্তমান সময়ে ইউরোপে অভিবাসীর সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা কম হলেও, সেউতার সাম্প্রতিক এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে—অভিবাসন সঙ্কট এখনও ইউরোপের মাথা ব্যথার অন্যতম বড় কারণ।