১২৫ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য! বেলুড় মঠে মহাষষ্ঠীর ভোরে শুরু হল বিশ্বফেমাস দুর্গাপূজা

চিরাচরিত ভক্তি, শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা এবং অনন্য ঐতিহাসিক ঐতিহ্য মেনে বেলুড় মঠে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হল ২০২৬ সালের শ্রীশ্রীদুর্গাপূজা। আজ মহাষষ্ঠীর পুণ্যতিথিতে রামকৃষ্ণ মিশন সদর কার্যালয়ে এই উৎসবের সূচনা হয়। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে, এদিন ভোরে দেবীর কল্পারম্ভের মধ্য দিয়ে পুজোর মূল পর্ব শুরু হয়। সন্ধ্যায় শাস্ত্রীয় রীতিনীতি মেনে অনুষ্ঠিত হবে মা দুর্গার বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস।

মহাষষ্ঠীর ভোরে গঙ্গা থেকে দুর্গাপুজোর ঘটে জল ভরে আনেন মঠের সন্ন্যাসীরা। সকাল ৬টায় মণ্ডপে নির্দিষ্ট আচার মেনে ঘট স্থাপন ও কল্পারম্ভ সম্পন্ন হয়। গঙ্গার তীরবর্তী মূল মন্দিরের পাশে তৈরি বিশেষ পূজামণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের জন্য সকাল থেকেই পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। দেবীর আরাধনার পাশাপাশি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেব, মা সারদা দেবী এবং স্বামী বিবেকানন্দের চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে ভক্তরা পূজার সূচনা করেন। আজকের এই পুণ্য লগ্ন সম্পর্কে বেলুড় মঠের প্রবীণ এক সন্ন্যাসী জানান যে, ষষ্ঠীর বোধন হল মা দুর্গাকে আমাদের হৃদয়ে এবং মণ্ডপে জাগ্রত করার আহ্বান। বিশ্বকল্যাণ ও সকলের অন্তরের আসুরিক প্রবৃত্তির বিনাশের জন্য মায়ের কাছে প্রার্থনা জানানো হচ্ছে।

এই দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে ১২৫ বছর আগে, ১৯০১ সালে। সনাতন সন্ন্যাস ধর্মের প্রথা ভেঙে স্বামী বিবেকানন্দ মঠে প্রথম মৃন্ময়ী মূর্তিতে মা দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের ভ্রূকুটি এড়াতে স্বামীজি এই পূজার সংকল্প করেছিলেন স্বয়ং শ্রীশ্রীমা সারদা দেবীর নামে। ১৯০১ সালের প্রথম পুজোয় স্বামীজি নিজে বেলতলায় বসে দেবীকে আবাহন জানিয়ে আগমনী গান গেয়েছিলেন। সেই সময় সন্ধিপূজায় পশুবলির প্রস্তাব উঠলে মা সারদা দেবী তার তীব্র বিরোধিতা করেন এবং তাঁর নির্দেশেই বেলুড় মঠে রক্তপাতহীন বলির নিয়ম চালু হয়, যেখানে পশুর বদলে ফল ও আনাজ বলি দেওয়া হয়। স্বামীজির প্রবর্তিত এই পূজায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে একাসনে বসিয়ে খিচুড়ি প্রসাদ বিতরণ করা হয়েছিল, যা ছিল সামাজিক পুনর্জাগরণের এক অর্থবহ প্রতীক।

আজকের দিনেও সেই ১৯০১ সালের রীতিনীতি হুবহু মেনে চলা হয়। জাঁকজমকের চেয়ে এখানে ভক্তির প্রাবল্যই মূল আকর্ষণ। আজ সন্ধ্যার বোধন অনুষ্ঠানটি শারদীয় উৎসবের আনুষ্ঠানিক দ্বার উন্মোচন করবে। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের ভিড় সামলাতে মঠ কর্তৃপক্ষের তরফে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। মঠের এক স্বেচ্ছাসেবক জানান যে, ষষ্ঠী থেকেই মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে এবং বিশেষ করে অষ্টমীর কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজার দিন এই ভিড় আরও বাড়বে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত পানীয় জল ও লাইনের সুব্যবস্থা করা হয়েছে। যাঁরা মঠে সশরীরে উপস্থিত হতে পারছেন না, তাঁদের জন্য দূরদর্শন (ডিডি বাংলা) এবং বেলুড় মঠের অফিশিয়াল মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ষষ্ঠীর এই উৎসবমুখর আবহে বেলুড় মঠ এখন ভক্তি, ইতিহাস ও আনন্দের এক মহাসঙ্গম।