১০ মিনিটের চা-বিরতি না থাকলে আজ সব শেষ! মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে কী বললেন উত্তরপাড়ার শিক্ষিকা?

কৈলাস মানস সরোবরে যাওয়ার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। জীবনের শেষ সুযোগ হিসেবে সেই পবিত্র ধর্মীয় স্থান একবার চাক্ষুস করার লক্ষ্যেই পাড়ি দিয়েছিলেন উত্তরপাড়ার বাসিন্দা তথা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা অঞ্জনা সান্যাল। কিন্তু কৈলাস দর্শন তো দূরস্থান, চোখের সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখে এলেন তিনি। নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবলে পড়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন এই বাঙালি পর্যটক। বর্তমানে তাঁর চোখে-মুখে এখনও লেগে রয়েছে সেই ভয়াল অভিজ্ঞতার আতঙ্কের ছাপ। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও বিপদের মুখে দাঁড়িয়েও অদম্য জেদ বজায় রেখেছেন তিনি। সাফ জানিয়েছেন, বয়স সত্তরের কোঠায় পৌঁছালেও তিনি দমে যাবেন না; পরের বার হেলিকপ্টারেই কৈলাসে যাবেন এবং মানস সরোবরের জল মাথায় তুলবেন।
কলকাতার একটি নামী ভ্রমণ সংস্থার সঙ্গে নেপাল সফরে গিয়েছিলেন উত্তরপাড়ার ব্যানার্জী পাড়া স্ট্রিটের বাসিন্দা অঞ্জনাদেবী। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তাঁদের ১৭ জনের পর্যটক দলটি গত ২১ আগস্ট রক্সসল হয়ে নেপাল সীমান্ত পার করে কাঠমান্ডুতে পৌঁছায়। গত ২৬ আগস্ট সকালে সামান্য লাগেজ নিয়ে তাঁরা চিনা সীমান্তের খেড়ুঙের উদ্দেশে রওনা দেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তাঁদের সামনে নেমে আসে এক মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। রাস্তায় পরপর ট্যুরিস্ট বাস দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে প্রথমে তাঁরা কিছু বুঝে উঠতে পারেননি। পাহাড়ের গায়ে রোদ ঝলমলে দিনে ধোঁয়ার মতো কিছু একটা উড়তে দেখা গেলেও, পরে বোঝা যায় ওগুলো আসলে তীব্র বেগে নেমে আসা জলকণা। বিপরীত দিক থেকে আসা বাইকচালকরা জানান যে সেখানে হরপা বান (Flash Flood) নেমেছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে চালক সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে নেন।
কীভাবে এই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেলেন, সেই রোমহর্ষক বিবরণ দিয়ে অঞ্জনাদেবী জানান যে খেড়ুঙ যাওয়ার পথে ফ্রেশ হওয়ার জন্য তাঁদের বাসটি মাত্র দশ মিনিটের একটি চা-বিরতির জন্য দাঁড়িয়েছিল। সেই সামান্য বিরতিই তাঁদের ১৭ জনের পুরো দলটির জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে। যদি ওই দশ মিনিট বাস না দাঁড়াত, তবে তাঁদের গাড়ি আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে জ্যামের মধ্যে পড়ে যেত এবং সেক্ষেত্রে গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে আসার কোনো রাস্তা থাকত না। চোখের সামনে জীবন্ত বিপর্যয় দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। একদিকে কৈলাসে পৌঁছাতে না পারার গভীর মনঃকষ্ট এবং অন্যদিকে ছেলের পাঠানো সংবাদের আপডেট—সব মিলিয়ে এক ভীতিপ্রদ পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। এই বিপর্যয়ের নেপথ্যে চিনের প্রশাসনিক গাফিলতিকেও দায়ী করেছেন তিনি। হ্রদ বা হিমবাহ ভেঙে পড়ার পর প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় পেলেও চিন যদি আগে থেকে সতর্কবার্তা দিত, তবে এত মানুষের প্রাণহানি এড়ানো যেত বলে তাঁর অভিমত। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরার দীর্ঘদিনের অভ্যাস থাকলেও নেপালের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর স্মৃতি হয়েই থেকে যাবে।