“১০ বছরের আধিপত্যের পতন!”-ইতিহাস গড়ে সার্বিয়ার নির্বাচনে ছাত্রদের বিরাট জয়

ছাত্র আন্দোলনের তীব্র জনরোষের সামনে অবশেষে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ। ঐতিহাসিক নির্বাচনে বড়সড় পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন তিনি। এর মধ্য দিয়েই সার্বিয়ার রাজনীতিতে তাঁর বিগত এক দশকের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটল। সম্প্রতি দুর্নীতি, শিক্ষানীতির বিপর্যয়, অস্বাভাবিক জীবনযাত্রার খরচ এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে বিশ্বজুড়ে যে ছাত্র আন্দোলনের ঝড় উঠেছে, তারই রেশ ধরে সার্বিয়ার এই অভূতপূর্ব জয় এখন বিশ্বরাজনীতিতে এক নয়া ট্রেন্ড সেট করছে।
ভুচিচের হার স্বীকার ও ঐতিহাসিক উত্থান
ইউরোপের বলকান উপদ্বীপে অবস্থিত প্রায় ৬৬ লক্ষ জনসংখ্যার স্থলবেষ্টিত দেশ সার্বিয়ায় গত রবিবার অনুষ্ঠিত হয় সংসদীয় নির্বাচন। প্রাথমিক ফলাফলেই ছাত্র সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর বড় জয় নিশ্চিত হওয়ার পর আলেকজান্ডার ভুচিচ সোজা পরাজয় মেনে নেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, “এটা স্পষ্ট, আমরা এই নির্বাচনে হেরেছি এবং ছাত্র আন্দোলনের জয় হয়েছে।”
এই ঘোষণার পরপরই রাজধানী বেলগ্রেডের রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার মানুষ। উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। ২৫০ আসনের সার্বীয় সংসদে ছাত্র সমর্থিত প্রার্থীরা পেতে চলেছেন প্রায় ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন, যেখানে শাসকদল সার্বিয়ান প্রোগ্রেসিভ পার্টি আটকে গেছে মাত্র ১০৫টি আসনে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে নোভি সাদের এক রেলস্টেশনের ছাউনি ভেঙে ১৬ জনের করুণ মৃত্যুর পর থেকেই এই আন্দোলনের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে দাবানলের মতো ছড়াচ্ছে ছাত্র বিক্ষোভ
সার্বিয়ার এই জয় আসলে ইউরোপ থেকে এশিয়া জুড়ে তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই এক বিশাল বিস্ফোরণ। সার্বিয়ার আন্দোলনকারীরা যেভাবে দুর্নীতি দমন ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবিতে সফল হয়েছেন, তার ছায়া এখন বিশ্বজুড়ে:
ফ্রান্স: গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাস থেকে ফ্রান্সে বিক্ষোভ শুরু হয়। শ্রেণিকক্ষে স্থান সংকট ও শিক্ষক ঘাটতির প্রতিবাদে লিসে সাঁ-একজুপেরি স্কুলের পড়ুয়াদের আন্দোলন মুহূর্তে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নামেন প্রায় ৫ থেকে ৮ লক্ষ মানুষ।
ইতালি ও আলবেনিয়া: শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ইতালির মিলান রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। অন্যদিকে, আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি ও সরকারি প্রকল্পের বিরোধিতায় প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে দাঙ্গা পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন হাজার হাজার ছাত্র।
জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিস: বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা চালু করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানো এবং আকাশছোঁয়া আবাসন খরচের প্রতিবাদে এই দেশগুলোতেও রাস্তায় নেমেছেন পড়ুয়ারা।
ভারতেও যুব আন্দোলনের আঁচ: NEET বিতর্ক ও রাজনীতির গতিবদল
ইউরোপের পাশাপাশি ভারতেও ২০২৬ সালের NEET-UG পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিশাল ছাত্র বিক্ষোভ গড়ে ওঠে। পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েন প্রায় ২০ লক্ষ পরীক্ষার্থী। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)-র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই অনলাইন যুব আন্দোলন দ্রুত জাতীয় রাজনীতিকে নাড়িয়ে দেয়।
গত ২০ জুলাই নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়া হাজার হাজার পড়ুয়া সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে। আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। অবশেষে গত ২৫ জুলাই বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান— যা প্রমাণ করে ছাত্রশক্তির আন্দোলন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পাল্টে দিতে কতটা প্রভাবশালী।
সার্বিয়ার এই ফলাফলের গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য
অন্যান্য দেশে ছাত্রদের আন্দোলন কেবল রাজপথেই সীমাবদ্ধ থেকেছে, কিন্তু সার্বিয়ায় তরুণ সমাজ কেবল রাজপথে লড়াই করেনি— তারা ভোটে জিতে সরাসরি শাসন ক্ষমতায় আঘাত হেনেছে। শিক্ষক, বিজ্ঞানী, অভিনেতা থেকে শুরু করে কৃষকদের এক ছাতার তলায় এনে আন্দোলনের নেতা ইলিয়া সার্দানোভিচ এই ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে এনেছেন।
বিশ্বের প্রতিটি দেশের আন্দোলনের দাবি হয়তো এক নয়— কোথাও আবাসন সংকট, কোথাও দুর্নীতি, আবার কোথাও শিক্ষানীতি। কিন্তু সার্বিয়া থেকে ভারত পর্যন্ত ঘটা সাম্প্রতিক এই ঘটনা প্রবাহ স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতার বিরুদ্ধে এখন চালকের আসনে উদীয়মান তরুণ প্রজন্ম!