স্বামীর মৃত্যুর পরই বদলে ফেললেন জেন্ডার! ৩৭ বছর পুরুষের ছদ্মবেশে কাটিয়ে দেওয়া এই নারীর আসল রহস্য কী?

তামিলনাড়ুর একটি ছোট্ট গ্রামে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যিনি সকলের কাছে ‘মুথু মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন—সাদা জামা, ধুতি, মাথায় ছোট চুল এবং মুখে বিড়ি যাঁকে দেখতে একেবারে সাধারণ পুরুষের মতো করে তুলেছিল—তাঁর আসল পরিচয় জানলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক হতভাগা মহিলার দীর্ঘ ৩৭ বছরের লড়াই ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। তাঁর আসল নাম পেচিয়াম্মাল, যিনি কেবল নিরাপত্তা, আত্মসম্মান এবং মেয়েকে মানুষ করার তাগিদে পুরুষের পরিচয়ে জীবন কাটিয়েছেন।
মাত্র কুড়ি বছর বয়সে পেচিয়াম্মালের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে বিয়ের মাত্র পনেরো দিনের মাথায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী শিবা। সেই কঠিন সময়ে তিনি জানতে পারেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। স্বামীহারা অবস্থায় এক কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়ে পেচিয়াম্মাল সংসারের ঘানি টানতে তামিলনাড়ুর থুথুকুডির একটি কয়লার কারখানায় শ্রমিকের কাজ শুরু করেন।
এরপরই ঘটে যায় এমন এক ভয়াবহ ঘটনা, যা তাঁর জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়। একদিন কারখানায় কাজ করতে যাওয়ার পথে এক ট্রাকচালক তাঁকে জোর করে গাড়িতে তুলে অপহরণের চেষ্টা করেন। চরম সাহসিকতার সঙ্গে নিজেকে রক্ষা করলেও সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। তিনি বুঝতে পারেন, একা একজন অসহায় মহিলার পক্ষে এই সমাজে মাথা উঁচু করে নিরাপদে বেঁচে থাকা কতটা দুরূহ।
পরের দিনই তিনি এক সাহসী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। বাজার থেকে একটি শার্ট ও ধুতি কিনে তিরুচেন্দুরে গিয়ে নিজের মাথা মুড়িয়ে পুরুষের পোশাক পরে ফেলেন। সেই মুহূর্তেই চিরতরে হারিয়ে যায় পেচিয়াম্মালের নারী পরিচয়, আর জন্ম হয় ‘মুথু’ নামের এক লড়াকু পুরুষের। পরবর্তীতে বিভিন্ন খাবারের দোকানে রান্নার কাজ করার সুবাদে তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘মাস্টার’ উপাধি।
এরপর মেয়েকে নিয়ে কট্টুনাইক্কানপট্টি গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন মুথু। সেখানে গ্রামবাসীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন পুরুষ। মাঠে ঘাটে কঠোর পরিশ্রম করে তিনি সকলের বিশ্বাস অর্জন করেন। এমনকী তাঁর নিজের মেয়েকেও দীর্ঘকাল মায়ের আসল পরিচয় গোপন রাখতে হয়েছিল। ছদ্মবেশ নিখুঁত রাখতে তিনি বিড়ি টানার অভ্যাসও গড়ে তোলেন। তাঁর মতে, এই বিড়িই বহুবার তাঁকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। এক রাতে এক মদ্যপ ব্যক্তি কাছে এলে তিনি বিড়ি ধরিয়ে দেন, আর সেই লোক তাঁকে পুরুষ ভেবে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করে চলে যায়।
পুরুষের এই ছদ্মবেশ তাঁর কাছে কোনো শখের বিষয় ছিল না, বরং এটি ছিল এক নির্মম পৃথিবীতে বেঁচে থাকার একমাত্র ঢাল। ঋতুস্রাবের দিনগুলিতেও তাঁকে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হতো, যাতে কেউ সামান্যতম সন্দেহও না করতে পারে। আজ তাঁর মেয়ে বড় হয়েছে এবং জীবন অনেকটাই স্থিতিশীল। তবুও নিজের পুরনো নারী পরিচয়ে আর ফিরে যেতে চান না মুথু। তাঁর দৃঢ় বক্তব্য, এই পুরুষ পরিচয়ই তাঁকে জীবনের সবচেয়ে দুর্বল সময়ে সাহস ও নিরাপত্তা জুগিয়েছে। তাই তিনি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ‘মুথু’ হয়েই বেঁচে থাকতে চান।