স্বামীর কাছে হাত পাততে হয় না আর! বিশ্বকর্মা পুজো আসতেই গ্রামের নারীদের মুঠোর মুঠোয় উপার্জনের জোয়ার!

কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত দুর্গাগ্রাম, যা স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত আদরের সঙ্গে ‘দুগো’ নামে পরিচিত। এই ছোট্ট গ্রামটিতে প্রায় পাঁচ দশক ধরে অত্যন্ত নিপুণভাবে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী মালা তৈরির কাজ। গ্রামের বিখ্যাত মালাকার পাড়ার বেশ কিছু পরিবার রেশম, পাট, জরি ও নানা আকর্ষণীয় উপকরণ দিয়ে অত্যন্ত সুন্দর ও রংবেরঙের বাহারি মালা তৈরি করে থাকেন। কলকাতার বড়বাজার থেকে পাইকারিভাবে কাঁচামাল এনে ডাইসের ওপর নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী সাজিয়ে, কেটে ও ফিটিং করে তৈরি করা হয় এই নজরকাড়া মালাগুলি। বিশেষ করে বিশ্বকর্মা পুজোর মরশুম আসার আগেই এই শিল্পের চাহিদা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে এখন ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত গোটা গ্রামজুড়ে চলছে চরম ব্যস্ততা।

এই শিল্প পেশার সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট কারিগর বাবু চুনারী জানান, তিনি প্রায় ১৪-১৫ বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং এটি তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন। তাঁর মতে, তাঁদের এই গ্রামে প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ঐতিহ্যবাহী কাজ চলে আসছে। রেশম, পাট, জরি ও কৃত্রিম ফুলসহ বিভিন্ন উপাদানে তৈরি এসব মালার দাম ৮০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। বর্তমানে বিশ্বকর্মা পুজোর মরশুম চলায় তাঁদের রাত-দিন এক করে কাজ করতে হচ্ছে। এই সমস্ত মালা নবদ্বীপ, রামপুরহাট ও আমোদপুর-সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়, যা তাঁদের এই নির্দিষ্ট সময়ে বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দেয়।

তবে শুধু পুরুষ কারিগররাই নন, এই কুটির শিল্পের সঙ্গে সমানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জড়িয়ে রয়েছেন গ্রামের অদম্য মহিলারাও। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না ও সংসারের সমস্ত গুরুদায়িত্ব সামলে তাঁরা এই কাজে বসে যান। এভাবেই রাত ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত একটানা চলে তাঁদের কর্মযজ্ঞ। বিশ্বকর্মা পুজোর এই বিশেষ মরশুম তাঁদের কাছে কেবল একটি উৎসব নয়, বরং সংসারে বাড়তি রোজগার নিশ্চিত করার অন্যতম বড় ভরসা। অন্য সময়ে কাজের চাপ কিছুটা কম থাকলেও এই দিনগুলির অপেক্ষাতেই থাকে প্রতিটি পরিবার।

স্থানীয় কারিগর মমতা দাস আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, সংসারের সমস্ত কাজ সেরে সারাদিন এই কাজ করি। এই পুজো আসতেই ভিন্‌ রাজ্য বা বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক বড় অর্ডার আসে। ফুল-ফল সাজানো থেকে শুরু করে ফিটিংয়ের সমস্ত কাজ আমরাই করি। এতে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো স্বামীর কাছে হাত পাততে হয় না, নিজেরাই স্বাধীনভাবে কিছু উপার্জন করতে পারি। এই পুজো এলেই আমাদের হাতে কিছু পয়সা-কড়ি থাকে, যা জীবনে বাড়তি আনন্দ এনে দেয়।

বিশ্বকর্মা পুজোর আর মাত্র কয়েকদিন বাকি থাকায় দুর্গাগ্রামের মালাকার পাড়ায় এখন দম ফেলারও ফুরসত নেই। কারও পাকা আঙুলে রেশমের সুতো, কারও হাতে পাট, আবার কেউ ব্যস্ত রঙিন ফুল আর জরি সাজাতে। রাত গভীর হলেও থামছে না পরিশ্রমের চাকা। কারণ এই কয়েকটি দিনই তাঁদের সারা বছরের অন্যতম ব্যস্ত সময়, আর এই কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বহু পরিবারের স্বাবলম্বী হওয়ার রঙিন স্বপ্ন। বড় কোনো কারখানা নয়, বরং গ্রামের সাধারণ কুটিরে হাতে তৈরি হওয়া এই রংবেরঙের মালাগুলিই এবার বিশ্বকর্মা পুজোয় রাজ্যের কোণায় কোণায় পৌঁছে গিয়ে দুর্গাগ্রামের ঘরে ঘরে ফিরিয়ে আনবে সাফল্যের অনাবিল হাসি।