‘স্বচ্ছতা’ না ‘মুখ বন্ধের কৌশল’? -DM দপ্তরে অভিযোগ জানাতে গেলেই লাগবে আধার কার্ড!

জেলাশাসকের দপ্তরে অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়ায় এবার এক নজিরবিহীন পরিবর্তন এল। এখন থেকে যে কোনও অভিযোগকারীকে আবেদনের সঙ্গে আধার কার্ডের ফটোকপি জমা দিতে হবে। এছাড়াও, অফিসের খাতায় সই এবং মোবাইল নম্বর লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দক্ষিণ দিনাজপুরের জেলাশাসকের দপ্তর ‘ভুয়ো’ অভিযোগ এড়াতে এবং ‘স্বচ্ছতা’ আনতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কেন এই হঠাৎ পরিবর্তন?
জেলাশাসকের দপ্তরে রাস্তার কাজে দুর্নীতি, বেআইনি নির্মাণ, এলাকায় নেশার আসর, এবং নিকাশিনালা বুজিয়ে দেওয়ার মতো নানা অভিযোগ জমা পড়ে। তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দক্ষিণ দিনাজপুরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৩৫০–৪০০টি অভিযোগ জমা হয়েছিল।
প্রশাসনের আধিকারিকরা তদন্তে নেমে দেখেন, এর মধ্যে বেশ কিছু অভিযোগের কোনো সারবত্তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতেও মিথ্যা অভিযোগ জানানো হচ্ছে। যেমন, সম্প্রতি বালুরঘাটের কামারপাড়ার বাসিন্দা বলে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির জুয়ার আসর সংক্রান্ত অভিযোগের কোনো সত্যতা তদন্তে পাওয়া যায়নি। এমন ‘ভুয়ো’ অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা চলতি বছর অক্টোবরে এই নতুন নির্দেশিকা জারি করেন।
জেলাশাসক বিজিন কৃষ্ণা বলেন, “প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা আনার জন্যই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।” রাজ্যের শাসকদল এই সিদ্ধান্তের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। তৃণমূলের জেলা মিডিয়া কনভেনর জয়ন্তকুমার দাস বলেন, “মিথ্যা অভিযোগ ঠেকাতেই এমন উদ্যোগ। যদি স্বচ্ছতা আনতেই হয়, তবে সকলেরই এই নিয়ম মানা উচিত।”
বিরোধীদের আশঙ্কা: ‘মুখ বন্ধ করার কৌশল’
যদিও এই নয়া নিয়মের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধীরা। তাদের আশঙ্কা, এর ফলে দুর্নীতির ঘটনাগুলি ‘সহজে আড়াল’ করা যাবে। তাদের মূল ভয়, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অভিযোগকারীরা আর সাহস করে কোনো কমপ্লেন করতে চাইবেন না।
কয়েক মাস আগে জেলার হরিরামপুরে একজন ‘অ্যানোনিমাস’ (পরিচয় গোপন রেখে) অভিযোগকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে রাস্তার কাজ না করা এক ঠিকাদারকে ব্ল্যাক লিস্ট করা হয়েছিল। বিরোধীরা এই উদাহরণ সামনে রেখে নয়া নিয়মকে ‘মুখ বন্ধ করার কৌশল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বিজেপির জেলা সভাপতি স্বরূপ চৌধুরীর মতে, “দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ জানাতে গেলেই পরিচয় ফাঁস হবে। যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একেবারেই শোভনীয় নয়।”
জেলা কংগ্রেস নেতা নন্দ দাসের বক্তব্য, “এর ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গোপন অভিযোগ আর আসবে না।”
সিপিএমের জেলা সম্পাদক নন্দলাল হাজরার মতে, “এটা মানুষকে ভয় দেখানোর নতুন পদ্ধতি। এতে সাধারণ মানুষের মুখ বন্ধ করা যাবে।”
বিরোধীরা মনে করছেন, যেখানে সরকারের উচিত সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করা, সেখানে এই নিয়ম উল্টো ফল দেবে।