সিলিন্ডারের দিন শেষ! বাড়ি বাড়ি পাইপলাইনে গ্যাস পৌঁছাতে কড়া পদক্ষেপ কেন্দ্রের, মানতে হবে নতুন নিয়ম

দেশের প্রতিটি ঘরে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস বা পিএনজি (PNG) এর ব্যবহার দ্রুত প্রসারিত করতে এবার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিকে কঠোর নির্দেশিকা দিল কেন্দ্র সরকার। গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা এবং পেট্রোলিয়াম বিপণন সংস্থাগুলির সাথে নিবিড় সমন্বয় সাধনের জন্য প্রতিটি জেলা স্তরে অবিলম্বে একজন করে নোডেল অফিসার নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত যে সমস্ত এলাকায় ইতিমধ্যেই গ্যাস পাইপলাইনের পরিকাঠামো সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে, সেই সমস্ত এলাকার প্রতিটি ঘরকে পাইপযুক্ত রান্নাঘরের গ্যাসের সাথে দ্রুত সংযুক্ত করার লক্ষ্যেই এই বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পেট্রোলিয়াম সচিব নীরজ মিত্তল সম্প্রতি দেশের সমস্ত রাজ্যের মুখ্যসচিবদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা পাঠিয়েছেন। সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, পিএনজি অত্যন্ত নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, পরিচ্ছন্ন এবং তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক একটি জ্বালানি মাধ্যম। এর ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে প্রচলিত এলপিজি বা রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার সরবরাহের ওপর অতিরিক্ত বোঝা অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে গ্যাস বিতরণ পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তারও সর্বোচ্চ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার এই বিষয়ে জেলা স্তরে সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও নজরদারি চাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে ভারতে এলপিজি আমদানির সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। ভারত তার মোট অভ্যন্তরীণ এলপিজির চাহিদার একটি বিশাল অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকে, যার সম্পূর্ণ সরবরাহ মূলত সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। এই ধরনের আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রান্নাঘরের গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে হিমশিম খেতে হয় এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এর বিপরীতে, গার্হস্থ্য পিএনজি সরবরাহ বা পাইপযুক্ত গ্যাস পরিকাঠামো মূলত দেশীয় উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এই ধরনের বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। এই কারণেই সরকার এখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেই সমস্ত অঞ্চলে এলপিজির ব্যবহার কমিয়ে দ্রুত পিএনজিতে রূপান্তর করতে চাইছে যেখানে পাইপলাইনের সুবিধা ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য সরকার নতুন কিছু নির্দেশিকা ও আইন কার্যকর করেছে। প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পেট্রোলিয়াম পণ্য বিতরণ সম্পর্কিত নতুন আদেশ এবং প্রয়োজনীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫-এর ধারা তিন-এর অধীনে এলপিজি নিয়ন্ত্রণ আদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়েছে। নতুন এই নিয়মগুলির অধীনে, যে সমস্ত এলাকায় পাইপযুক্ত গ্যাস বা পিএনজির সংযোগ ইতিমধ্যেই উপলব্ধ রয়েছে, সেখানে একই পরিবারে এলপিজি এবং পিএনজি উভয় সংযোগ একসঙ্গে রাখার অনুমতি আর দেওয়া হবে না। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নোটিশ পাওয়ার পরেও যারা পিএনজি সংযোগের জন্য আবেদন করবেন না, তাঁদের বর্তমান এলপিজি সংযোগ বা সিলিন্ডার সরবরাহ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
এই গোটা প্রক্রিয়াটিকে সময়মতো সম্পন্ন করার জন্য প্রতিটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় একটি করে পিএনজি সমন্বয় কমিটি (PCC) গঠন করা হবে। এই কমিটি সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিটি আবাসন সোসাইটি এবং যোগ্য বাড়িগুলি চিহ্নিত করবে, প্রয়োজনীয় নোটিশ জারি করবে এবং সাধারণ ভোক্তাদের সচেতন করতে বিশেষ শিবিরের আয়োজন করবে। মন্ত্রক জানিয়েছে যে পূর্বেও এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল, তবে একে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। জেলা প্রশাসনকে রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনগুলির সাথে সমন্বয় করে পাইপলাইন পাতার পথ সুগম করা, ডিস্ট্রিবিউটর ও কোম্পানিগুলির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানো এবং গ্রাহকদের সমস্ত অভিযোগ দ্রুত সমাধান করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এড়াতে এবং দেশের শক্তির নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করতে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র।