সিপিআর কি জীবনের নিশ্চিত গ্যারান্টি? নানা পাটেকরের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরই প্রকাশ্যে এল চিকিৎসাবিজ্ঞানের চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের আকস্মিক প্রয়াণে এখনও শোকস্তব্ধ গোটা দেশ। ঘুমের মধ্যেই তাঁর কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে। মৃত্যুর আগে হাসপাতালে টানা ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে সিপিআর দেওয়া হলেও শেষরক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এত দীর্ঘ সময় ধরে সিপিআর চলার পরেও কেন অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না? এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন কলকাতার বিশিষ্ট কার্ডিও সার্জেন ডাঃ সৌম্য গুহ।

চিকিৎসকদের মতে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে হৃদ্‌যন্ত্র রক্ত পাম্প করা হঠাৎ বন্ধ করে দেয়। এই অবস্থায় বুকের উপর চাপ দিয়ে সিপিআর-এর মাধ্যমে সাময়িকভাবে কৃত্রিম রক্তসঞ্চালন চালু রাখার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সিপিআর শুরু করলেই হৃদ্‌স্পন্দন নিশ্চিতভাবে ফিরে আসবে। ডাঃ গুহর সাফ কথা, সিপিআর হৃদ্‌যন্ত্রকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনার কোনো ম্যাজিক সুইচ নয়। এটি মূলত মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র এবং শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে কিছুটা হলেও অক্সিজেন ও রক্ত পৌঁছে দেওয়ার একটি সাময়িক প্রচেষ্টা মাত্র। যদি হার্টের ক্ষতি খুব বেশি হয় বা ধমনিতে মারাত্মক রক্ত জমাট বেঁধে থাকে, তবে শুধু বাইরে থেকে বুকে চাপ দিয়ে সেই পাম্পিং ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে রাতের দিকে এই ধরনের ঝুঁকি আরও বেশি থাকে বলে মত চিকিৎসকদের। রাতে শরীরের স্বাভাবিক স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তনের সঙ্গে রক্তচাপ কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে প্রবীণ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হৃদ্‌রোগের উপসর্গ অনেক সময় স্পষ্ট বোঝা যায় না। ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির কারণে ব্যথার অনুভূতি কম থাকায় অনেক সময় ‘সাইলেন্ট’ হার্ট অ্যাটাক ঘটে যায়, যা বুঝতে অনেকটাই দেরি হয়ে যায়। নানা পাটেকরের ক্ষেত্রেও গোয়ার মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসকরা ময়নাতদন্তের পরেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন বলে জানিয়েছেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট যত দীর্ঘ হয়, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতির আশঙ্কা ততটাই বাড়ে। সিপিআর চলাকালীন যদি পর্যাপ্ত রক্তচাপ বজায় না থাকে, তবে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কসহ অন্যান্য অঙ্গ অকোজে হতে থাকে। ৪৫ মিনিট বা এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সিপিআর চললেও তা নির্দিষ্ট কোনো সময়ের পর কার্যকারিতা হারাবে—এমন কোনো সর্বজনীন সময়সীমা নেই। রোগীর বয়স, অ্যারেস্টের কারণ এবং শরীর চিকিৎসার প্রতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, তার ওপর পুরো বিষয়টি নির্ভর করে। তবে শত ব্যর্থতার মধ্যেও চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সময় কোনো কিছু না করার চেয়ে দ্রুত সঠিক উপায়ে সিপিআর শুরু করা অত্যন্ত জরুরি, যা বহু ক্ষেত্রেই জীবন বাঁচানোর একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে।