“সরকার নয়, আসল মালিক জনগণ!” সংবিধানের প্রথম লাইনেই লুকিয়ে ৭৬ বছরের সবচেয়ে বড় গোপন সত্য?

“আমরা, ভারতের জনগণ…”: সংবিধানের প্রথম লাইনেই লুকিয়ে দেশের আসল শক্তির গোপন উৎস
ভারতের সংবিধানের প্রথম পাতাটি খুললেই যে লাইনটি চোখে পড়ে, তা আমাদের সবার পরিচিত— “We, the people of India…” বা “আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ…”।
উপরিভাগে এই শব্দকটা সাধারণ মনে হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দর্শন। ভারতের সংবিধান কিন্তু বলতে পারত, “সরকার এতদ্বারা তার প্রজা বা নাগরিকদের জন্য এই আইন প্রদান করছে…”। কিন্তু তা না বলে ক্ষমতা হস্তান্তরের রূপরেখাটি সম্পূর্ণ উল্টে দেওয়া হয়েছিল। এখানে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি বা ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস সরকার নয়, বরং দেশের সাধারণ জনগণ। জনগণই নিজেদের শাসন করার জন্য রাষ্ট্রকে ক্ষমতা প্রদান করেছে।
ঐতিহাসিক এক অমীমাংসিত বৈপরীত্য: মাত্র ১৫% মানুষের ভোটে তৈরি গণপরিষদ!
এই ঐতিহাসিক শব্দবন্ধটি লেখার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক পরম বিস্ময়কর ইতিহাস। ১৯৪৬ সালে যে গণপরিষদ (Constituent Assembly) ভারতের সংবিধান লেখার দায়িত্বে বসেছিল, তারা কিন্তু আজকের মতো সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত হয়নি।
তৎকালীন ব্রিটিশ আমলের আইন অনুযায়ী, কেবল বিপুল সম্পত্তি, করপ্রদান ও নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা মাত্র ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ, দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ—যার মধ্যে ছিলেন কোটি কোটি নারী, খেটে খাওয়া দিনমজুর, কৃষক এবং দরিদ্র-প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—সংবিধান প্রণেতাদের নির্বাচনের অধিকারই পাননি।
তাহলে গণপরিষদ কীভাবে পুরো দেশের ১৪০ কোটি (তৎকালীন ৩০-৪০ কোটি) মানুষের নামে “আমরা, ভারতের জনগণ” লিখতে পারল? ইতিহাসবিদদের মতে, এটি কেবল একটি বাস্তব ঘটনা ছিল না, এটি ছিল অনাগত ভবিষ্যতের জন্য দেওয়া এক মহৎ ‘প্রতিশ্রুতি’। গণপরিষদের সদস্যরা জানতেন, তারা যে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত দেশবাসীকে প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাঁদের কাছে এই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য। আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছিল ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে, যখন প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক ভারতীয়কে দেওয়া হলো ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’-এর পরম অধিকার।
৪২তম সংশোধনী ও ‘সমাজতান্ত্রিক- ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দের বিতর্ক
১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর যে মূল প্রস্তাবনাটি গৃহীত হয়েছিল, তাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ পরে যুক্ত হয়। ১৯৭৬ সালে জরুরি অবস্থার সময় তৎকালীন কেন্দ্র সরকারের আমলে সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় দুটি নতুন শব্দ—“সমাজতান্ত্রিক” (Socialist) এবং “ধর্মনিরপেক্ষ” (Secular) যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি “জাতির ঐক্য” কথাটি বদলে করা হয় “জাতির ঐক্য ও সংহতি”।
আজও সুপ্রিম কোর্ট ও দেশের আইনি মহলে এই শব্দসংযোজন নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা যায়। বিরোধীদের একাংশের যুক্তি, জরুরি অবস্থার সময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থগিত থাকায় এই পরিবর্তনগুলি আনা অনুচিত ছিল। অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুটি শব্দ আলাদা করে যুক্ত করার আগেই সংবিধানের প্রতিটি অনুচ্ছেদে ওই মূল্যবোধগুলি সুপ্ত অবস্থায় বিদ্যমান ছিল।
‘We, The People’-এর আসল গভীরতা কোথায়?
প্রখ্যাত সংবিধান বিশারদ গ্র্যানভিল অস্টিনের ভাষায়, সূচনাটা ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতায় ভরা থাকলেও ভারতের সংবিধান সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পেরেছে কেবল একটি কারণে—একটি নির্বাচনের পর আরেকটি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশবাসী সেই মূল প্রতিশ্রুতিকে বারবার সত্য বলে প্রমাণ করেছে।
প্রতিবার যখন একজন সাধারণ নাগরিক বুথে গিয়ে ভোট দেন, মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন, কিংবা আইনের চোখে সমান সুবিচারের আশা করেন—তখনই এই ‘We, The People’ শব্দবন্ধটি বাস্তবে রূপ নেয়।
১৯৪৯ সালে দেশের প্রতিটি মানুষের সই হয়তো সংবিধানের পাতায় ছিল না, কিন্তু প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচার ও ভাইচারা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার লেখা হয়েছিল, তা আজও ভারতের গণতন্ত্রকে বিশ্বের বুকে সর্বোচ্চ স্তম্ভ হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।