‘সন্ত্রাসবাদে যুক্ত থাকার হুমকি’! ২৬ দিন গৃহবন্দি রেখে নয়ডার ৬৩ বছরের ব্যবসায়ীর থেকে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা লুট

নয়ডায় সাইবার অপরাধের এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও হাড়হিম করা ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দিল্লি পুলিশ এবং এক শীর্ষস্থানীয় তদন্তকারী সংস্থার ভুয়ো কর্মকর্তা সেজে সেক্টর ৭৮-এর বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী এক প্রবীণ ব্যবসায়ী মনোজ আগরওয়ালের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা। সন্ত্রাসবাদ এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওই ব্যবসায়ীকে লাগাতার ২৬ দিন ধরে ভিডিও কলের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। এর ফলে তিনি পরিবারের সদস্য বা বাইরের কারও সঙ্গেই কোনো রকম যোগাযোগ করতে পারেননি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত ২৭ জুলাই, ২০২৬ তারিখে এক ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপে মনোজ আগরওয়ালকে কল করে। নিজেকে রঞ্জিত কুমার বলে পরিচয় দিয়ে সে দাবি করে যে সে দিল্লি পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এর পরেই ওই ব্যবসায়ীকে একটি ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে থাকার কথা বলে চরম গ্রেপ্তারির হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রতারকচক্র নিজেদের উত্তরপ্রদেশ স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এবং ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)-এর শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে জাহির করে। সন্ত্রাসবাদ ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধে নাম জড়ানোর কথা বলে তারা ব্যবসায়ীকে প্রবল মানসিক চাপে ফেলে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে তিনি যেন একটানা ভিডিও কলের সংযোগে থাকেন এবং অন্য কারও সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই যোগাযোগ না করেন। নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। এভাবেই গত ২৭শে জুলাই থেকে ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে ব্ল্যাকমেলিং ও হয়রানির পালা চলে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে দফায় দফায় ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয়। নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী, গত ৭ আগস্ট ৯৫.৫ লক্ষ টাকা, ১১ আগস্ট ২০.২০ লক্ষ টাকা এবং ৩১ আগস্ট আরও দুটি ধাপে যথাক্রমে ২০ লক্ষ ও ১০ লক্ষ টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। এইভাবে প্রতারকদের বলে দেওয়া বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ১ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা জমা দিতে বাধ্য হন ওই ব্যবসায়ী। কিন্তু লাগাতার টাকার দাবি এবং তাদের কার্যকলাপের ধরন দেখে একসময়ে ব্যবসায়ীর মনে তীব্র সন্দেহ দানা বাঁধে।
অবশেষে সমস্ত পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মনোজ আগরওয়াল বুঝতে পারেন যে তিনি এক বিশাল সাইবার প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন। বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতারকরা তাঁর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর তিনি কালবিলম্ব না করে একটি সরকারি সাইবার ক্রাইম পোর্টালে গিয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন।
এই মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রসঙ্গে নয়ডার সাইবার সেলের ডিসিপি শশৈব্য গোয়েল গণমাধ্যমকে জানান যে, সাইবার ক্রাইম থানায় ইতিমধ্যেই একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ রুজু করা হয়েছে। যে সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলিতে এই প্রতারণামূলক অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে, পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সেগুলি খতিয়ে দেখছে। পাশাপাশি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লেনদেন সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে পুনরায় সতর্ক করে জানানো হয়েছে যে, পুলিশ, সিবিআই, ইডি কিংবা অন্য কোনো কেন্দ্রীয় বা রাজ্য তদন্তকারী সংস্থা কখনো ফোন বা ভিডিও কলের মাধ্যমে কাউকে গ্রেপ্তার করে না বা ডিজিটাল অ্যারেস্ট করে না। তাই এ ধরনের কোনো হুমকি পেলে ভয় না পেয়ে অবিলম্বে কল কেটে দিন এবং স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করুন।