শ্বাস নিতে না পেরে হাঁসফাঁস দশা, কার্যত দমবন্ধ হতে চলেছে পাকিস্তানের? জানুন কেন?

এমনিতেই পাকিস্তানে বায়ুদূষণ চরম অবস্থায় পৌঁছেছে, তার ওপর সমস্যা এবার আরও গুরুতর হওয়ার পথে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তপ্ত যুদ্ধের জেরে এবার কার্যত হাঁসফাঁস দশা তৈরি হয়েছে পুরো পাকিস্তানে। এই আন্তর্জাতিক সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস)-এর সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হঠাৎ করেই লাফিয়ে বেড়ে গিয়েছে কয়লা ও তেলের মতো ক্ষতিকর জ্বালানির ব্যবহার, যার জেরে ভয়াবহ বায়ু দূষণ নিয়ে নতুন করে মারাত্মক শঙ্কায় পড়েছে সে দেশের প্রশাসন। লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, ইসলামাবাদ এবং মুরির মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে ইতিমধ্যেই বাতাসের গুণমান আশঙ্কাজনকভাবে নিম্নমুখী। ফলে কনকনে শীত পুরোপুরি আসার আগেই পঞ্জাব প্রদেশে ধোঁয়াশা বৃদ্ধির ঝুঁকি হু হু করে বাড়ছে।

পাকিস্তানে এলএনজি-র এই তীব্র ঘাটতি সাধারণ মানুষের বাড়িঘর এবং কলকারখানায় নিয়মিত গ্যাস সরবরাহকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক ড. শাইস্তা তাবাসসুম ঘটনার ভয়াবহতা নিয়ে জানাচ্ছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে। কাতার থেকেও পাকিস্তানে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন এক চরম জায়গায় পৌঁছেছে যে, গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চড়া দামের কারণে বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অন্য নিম্নমানের জ্বালানির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।

পাকিস্তানে এলএনজি-র অনটন মেটাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যেভাবে দ্রুত বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে, তা মূলত পরিবেশের বিষ ঢালছে। কয়লা ও ভারী জ্বালানি তেল পোড়ানোর ফলে বাতাসের মধ্যে অনবরত ক্ষতিকারক ধোঁয়া এবং অতিসূক্ষ্ম দূষণকারী মারাত্মক কণা নির্গত হচ্ছে। এই দূষিত কণাগুলো মুহূর্তের মধ্যে বায়ুর স্বাভাবিক গুণমান ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের ফুসফুস ও স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি সাধন করছে। এই ধরনের ক্ষতিকারক জ্বালানিগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার বাড়ার ফলে ইতিমধ্যেই দূষিত হয়ে থাকা শহরের পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের এই অপ্রত্যাশিত অস্থিরতা পাকিস্তানের ভঙ্গুর বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকেও চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অবশ্য পাকিস্তানে এই প্রাণঘাতী ধোঁয়াশার সমস্যা শুধু গ্যাসের ঘাটতি বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত বিষাক্ত জ্বালানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রাচীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অনিয়ন্ত্রিত কারখানার বিষাক্ত দূষণ, অগণিত ইটভাটার ধোঁয়া এবং রাস্তার ধুলোবালির মতো একাধিক বিষয় লাহোর ও পঞ্জাব প্রদেশের অন্য শহরের বাতাসকে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত করে তুলছে।

এর পাশাপাশি, বর্ষা ও শরৎ শেষে ফসল কাটার পর কৃষিজমিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ বা নাড়া পোড়ানোর প্রাচীন অভ্যাসও পাকিস্তানের বায়ুদূষণে সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ভূমিকা পালন করে চলেছে। শীতকালে বায়ুমণ্ডলের বিশেষ আবহাওয়াগত পরিবর্তন ও শুষ্কতার কারণে এই সমস্ত বিষাক্ত দূষণ দীর্ঘ সময় ধরে বাতাসের নিচের স্তরে আটকে থেকে যেতে পারে। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে, শহরের বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বিষাক্ত ধোঁয়া একত্রিত হয়ে পুরো পাকিস্তান জুড়ে মারাত্মক ধোঁয়াশা এবং স্বাস্থ্য সংকটের সমস্যাকে বহু গুণে বাড়িয়ে তুলেছে।