লোহিত সাগরে মহা বিপদের ঘণ্টা! ইয়েমেনের হুথি ও সোমালিয়ার আল-শাবাবের গোপন অস্ত্র চুক্তি ঘিরে চাঞ্চল্য

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বিশ্ব নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী এবং আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট সোমালি জঙ্গি সংগঠন ‘আল-শাবাব’-এর মধ্যে একটি শক্তিশালী অস্ত্র সরবরাহ ও সহযোগিতার গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই বিপজ্জনক চুক্তির মাধ্যমে ইয়েমেনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে সোমালিয়ায় দেদার পাচার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক সামরিক মানের অস্ত্র ও সমরাস্ত্র। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শগত মতপার্থক্য ভুলে এই দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর স্বার্থের মিলন ভবিষ্যতে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালান চক্রের মূল হোতা হিসেবে জিবরিল ‘এক-হাতের’ ইয়াহিয়া আলি নামের এক সোমালি ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আল-গাইদা অঞ্চলের এক অস্ত্র ব্যবসায়ীর প্রত্যক্ষ সহায়তায় হুথি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক অস্ত্র সংগ্রহ করতেন ওই ব্যক্তি। এরপর সেই অস্ত্র সুকৌশলে জলপথ ও স্থলপথ ব্যবহার করে সোমালিয়ায় সক্রিয় আল-শাবাব জঙ্গিদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। মূলত আল-শাবাব একটি কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী বিদ্রোহী সংগঠন হলেও তাদের আধুনিক অস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি ও উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, হুথিদের কাছে প্রচুর আধুনিক সমরাস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি মজুত থাকলেও ইয়েমেনের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের তীব্র প্রয়োজন ছিল। আর এই পারস্পরিক স্বার্থের লেনদেনই দুই শত্রুকে আজ একই মোহনায় নিয়ে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র সরবরাহের বিনিময়ে হুথিরা একদিকে যেমন মোটা অঙ্কের অর্থনৈতিক সুবিধা এবং আফ্রিকান ভূখণ্ডে একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক লাভ করছে, তেমনই আল-শাবাব পাচ্ছে তাদের কাঙ্ক্ষিত অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং সামরিক শক্তি সম্প্রসারণের রসদ। আর এই সম্ভাব্য সহযোগিতার সবচেয়ে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে চলেছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর। ইয়েমেন ও সোমালিয়ার মধ্যবর্তী এই জলপথ বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট। এই অঞ্চলে যদি হুথি এবং আল-শাবাবের মতো রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী সংগঠনগুলির পারস্পরিক প্রভাব ও যোগাযোগ আরও গভীর হয়, তবে লোহিত সাগর দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজ এবং পশ্চিমা দেশগুলির সামরিক স্বার্থের ওপর হামলার ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

যদিও তাত্ত্বিক দিক থেকে হুথিদের আদর্শ ও আল-কায়েদার চিন্তাধারার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরেই তীব্র মতপার্থক্য ও বিরোধ চলে আসছে। তাই এই সম্পর্ককে রাতারাতি কোনো আনুষ্ঠানিক ও পাকাপোক্ত ‘হুথি-আল-শাবাইন জোট’ হিসেবে চিহ্নিত করাটা কিছুটা ত্বরান্বিত হতে পারে। তবে গোয়েন্দা তথ্য ও সাম্প্রতিক অস্ত্র সরবরাহের এই রুট স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পারস্পরিক স্বার্থের তাগিদে এই দুই শক্তি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও কার্যকরী সীমিত সহযোগিতার পথে হাঁটছে। সময়মতো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই গোপন নেটওয়ার্কের বিস্তার রোধ করতে না পারলে, তা কেবল ইয়েমেন বা সোমালিয়া নয়, বরং সমগ্র লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে।