রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত ‘উত্তরায়ণ’ চত্বরের ঐতিহাসিক দরজা খুলছে পর্যটকদের জন্য! কবে থেকে শুরু হেরিটেজ ওয়াক?

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য বা ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ তকমা পাওয়ার পর এবার পর্যটকদের জন্য আরও এক অনন্য উপহার নিয়ে হাজির হলো বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। রবীন্দ্রভবন চত্বরে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত পাঁচটি ঐতিহ্যবাহী হেরিটেজ বাড়ি— উদয়ন, কোণার্ক, শ্যামলী, পুনশ্চ এবং উদীচী এবার সরাসরি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বভারতী সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যে বৃহস্পতিবার বাদে সপ্তাহে ছয় দিন বিশেষ ‘হেরিটেজ ওয়াক’ শুরু হয়েছে। ফলে দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকরা রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালার পাশাপাশি ঐতিহাসিক আশ্রম প্রাঙ্গণ আরও কাছ থেকে ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
আসন্ন দুর্গাপুজোর ঠিক পরেই পর্যটকরা কবিগুরুর এই বাসভবনগুলির অন্দরমহলে সরাসরি প্রবেশ করার বিশেষ সুযোগ পেতে পারেন বলে বিশ্বভারতী সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে, যদিও চূড়ান্ত দিনক্ষণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীরকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, “বাড়িগুলির প্রাচীন গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য যাতে কোনওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখা হবে। পর্যাপ্ত সুরক্ষাবিধি মেনে পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে এবং সেই অনুযায়ী সমস্ত প্রস্তুতি চলছে।” ছাতিমতলা সংলগ্ন উত্তরায়ণ চত্বরে গড়ে ওঠা এই পাঁচটি ঐতিহাসিক বাড়ি বর্তমানে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের (ASI) তত্ত্বাবধানে রয়েছে। কবিগুরু ছাড়াও এই বাড়িগুলিতে একসময় পদধূলি পড়েছিল মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, মাদার টেরেজা, চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ এবং কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের।
রবীন্দ্রভবনের আধিকারিক নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এই ভবনগুলি যখন নির্মিত হচ্ছিল, তখন চিত্রকর রবীন্দ্রনাথের এক নতুন সৃজনশীল রূপ ফুটে উঠছিল। এখানে বসেই কবি অজস্র গান ও কবিতা সৃষ্টির পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত সব ছবি এঁকেছেন। এই বাড়িগুলির মধ্যে ১৮৯৯ সালে শুরু হওয়া ‘উদয়ন’ গৃহের মূল নকশা করেছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৬ সালে জাপান সফরের অনুপ্রেরণায় তৈরি এই বাড়িতে শীতলপাটি ব্যবহার করে অভিনব প্রাকৃতিক ‘এসি’ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ১৯৪১ সালের ২৫ জুলাই এই উদয়ন গৃহ থেকেই অসুস্থ রবি ঠাকুর শেষবারের মতো কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। অন্যদিকে, ১৯১৯ সালে নির্মিত ‘কোণার্ক ভবন’-এর চাতালে বসত গান-কবিতার আসর এবং ১৯২৬ সালে এখানেই রবীন্দ্রনাথের পরিচালনায় প্রথম ‘নটীর পূজা’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। পাশাপাশি, তীব্র দাবদাহ থেকে বাঁচতে ১৯৩৫ সালে সম্পূর্ণ মাটি দিয়ে নির্মিত ‘শ্যামলী’ গৃহ এবং ১৯৩৬ সালে নির্মিত ‘পুনশ্চ’ ও ‘উদীচী’ ভবনের ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। ঐতিহ্য ও সুরক্ষার নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রেখেই বিশ্বভারতীর এই ঐতিহাসিক দরজাগুলি পর্যটকদের স্বাগত জানাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।