মোদক খেয়ে পড়ে যাওয়ায় চন্দ্রদেবের উপহাস! কোন অভিশাপে আজও ভীতি ছড়ায় গণেশ চতুর্থীর চাঁদ?

গণেশ চতুর্থী মানেই ঘরে ঘরে আনন্দঘন পরিবেশে বিঘ্নহর্তা বাপ্পার আগমন, মিষ্টিমুখের হুল্লোড় এবং ভক্তিভরে পুজোর আয়োজন। তবে এই মহাসমারোহের মধ্যেও এমন কিছু অত্যন্ত কঠোর ও গোপন নিয়ম রয়েছে, যা অনেকেই না জেনে অবহেলা করেন। শাস্ত্র মতে, গণেশ পুজোয় এমন দুটি প্রধান নিয়ম রয়েছে যা লঙ্ঘন করলে সংসারে চরম অমঙ্গল নেমে আসতে পারে। প্রথমত, সর্বদেবতার পূজ্য হওয়া সত্ত্বেও ভগবান গণেশকে কখনও তুলসী পাতা নিবেদন করা যায় না। দ্বিতীয়ত, গণেশ চতুর্থীর পবিত্র রাতে চাঁদের দিকে তাকানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই দুটি প্রাচীন নিয়মের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে চমকপ্রদ ও রোমাঞ্চকর দুটি পৌরাণিক উপাখ্যান।
প্রথমত, তুলসী পাতার নিষিদ্ধ হওয়ার নেপথ্য কাহিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। হিন্দু ধর্মে প্রায় প্রতিটি দেব-দেবীর আরাধনায় তুলসী পাতা অপরিহার্য হলেও গণেশ পুজোয় তা সম্পূর্ণ ব্রাত্য। পুরাণ অনুযায়ী, এক সময় তুলসী দেবী গঙ্গার পবিত্র তীরে গভীর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সেই সময়েই তরুণ বয়সের গণেশ সেই পথ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। গণেশের রূপলাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে তুলসী দেবী তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সেই সময়ে গণেশ আজীবন ব্রহ্মচারী থাকার ব্রত নিয়েছিলেন, যে কারণে তিনি সেই প্রস্তাব বিনীতভাবে ফিরিয়ে দেন। এই প্রত্যাখ্যানে অপমানিত হয়ে তুলসী দেবী ক্রুদ্ধ হন এবং গণেশকে অভিশাপ দেন যে, একদিন তাঁর ব্রহ্মচর্য ভঙ্গ হবে এবং তাঁর দুটি বিবাহ সম্পন্ন হবে।
তুলসীর এই অভিশাপে বেজায় রেগে যান স্বয়ং গণেশ। তিনিও পাল্টা অভিশাপ দিয়ে জানান যে, তুলসী কখনও দেবী রূপে মানুষের পুজো পাবেন না এবং তাঁকে এক ভয়ংকর অসুর শঙ্খচূড়কে বিবাহ করতে হবে। পরবর্তীতে উভয়েই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করলে গণেশ শান্ত হন। তিনি জানান যে, তাঁর দেওয়া অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে ফলবে, তবে তুলসী একটি পবিত্র উদ্ভিদ হিসেবে পৃথিবীতে সমাদৃত হবেন এবং ভগবান বিষ্ণুর অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠবেন। তবে গণেশের পুজোয় তাঁর পাতা কখনই স্থান পাবে না। সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই গণেশকে তুলসী পাতা অর্পণ করা নিষিদ্ধ।
দ্বিতীয় নিয়মের পেছনের গল্পটি আরও বেশি চিত্তাকর্ষক। একে ‘মিথ্যা কলঙ্ক’ বা ‘মিথ্যাচার দোষ’ বলা হয়। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, একবার গণেশ চতুর্থীর দিনে গণেশ পেটপুরে অতিরিক্ত মোদক ভোজন করে তাঁর ছোট বাহন ইঁদুরের পিঠে চড়ে নিজের ঠিকানায় ফিরছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনের কারণে ইঁদুরটি হঠাৎ হোঁচট খায় এবং মাটিতে পড়ে যায়, যার ফলে গণেশের পেট ফেটে সমস্ত মোদক বাইরে বেরিয়ে পড়ে। এই আকস্মিক কান্ড দেখে গণেশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মোদকগুলি কুড়িয়ে আবার পেটে ভরে একটি সাপ দিয়ে পেট বেঁধে ফেলেন। আকাশ থেকে পুরো ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছিলেন চন্দ্রদেব। তিনি গণেশের এই দুর্দশা দেখে নিজেকে সামলাতে না পেরে উচ্চৈঃস্বরে উপহাস করে হেসে ওঠেন।
চন্দ্রের এই অহংকারপূর্ণ ও ব্যঙ্গাত্মক হাসি দেখে প্রচণ্ড রেগে যান সিদ্ধিদাতা। তিনি তখনই চন্দ্রদেবকে অভিশাপ দেন যে, আজ থেকে যে ব্যক্তি তাঁর দিকে তাকাবে, তার জীবনে কোনো না কোনো মিথ্যা কলঙ্ক বা অপবাদ লেপটে যাবে এবং সমাজ তাকে চোর বলে গণ্য করবে। চন্দ্রদেব নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে গণেশ কিছুটা নমনীয় হয়ে জানান যে, বছরের বাকি দিনগুলিতে চাঁদ দেখলে কোনো দোষ হয় না, কিন্তু একমাত্র ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থীর রাতে চাঁদ দেখলে মিথ্যা অপবাদ নিশ্চিতভাবে লাগবে। সেই প্রাচীন বিশ্বাস থেকেই আজও গণেশ চতুর্থীর রাতে চাঁদ দেখা সম্পূর্ণ বারণ। যদি ভুলবশত কেউ এই নিয়ম ভেঙে চাঁদ দেখে ফেলে, তবে শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে স্যমন্তক মণির বিখ্যাত পৌরাণিক কাহিনি পাঠ বা শ্রবণ করলে সেই অভিশাপের প্রভাব কেটে যায়।