মেসেজ বা রিল স্ক্রোলিংয়েই সর্বস্বনাশ! একটু খেয়াল না করলে ভাঙতে পারে আপনার সাজানো সংসার!

সারাদিন অফিসের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বাড়ি ফিরে সঙ্গীকে নিজের মনের বিশেষ কথাগুলো বলতে শুরু করলেন। তিনি প্রথমে মন দিয়ে শুনলেন এবং মাথাও নাড়লেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত যেতে না যেতেই তাঁর সমস্ত মনোযোগ চলে গেল হাতের মুঠোয় ধরা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। কখনও নতুন কোনো নোটিফিকেশন চেক করা, কখনও টেক্সট মেসেজের উত্তর দেওয়া, আবার কখনও কথার মাঝেই ইনস্টাগ্রামে একের পর এক রিল স্ক্রোল করা—এই পরিচিত দৃশ্যটি এখন প্রায় প্রতিটি আধুনিক সংসারেরই এক বিষণ্ণ ও নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যদিও এই অভ্যাস নিয়ে হয়তো বড় কোনো হাতাহাতি বা ঝগড়া হচ্ছে না, কিন্তু মনে মনে একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যায়—’তুমি কি আদৌ আমার কথা শুনছ?’ সম্পর্কের এই নতুন এবং নীরব সঙ্কটকে মনোবিদরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে নাম দিয়েছেন ‘অ্যাটেনশন ইনফিডেলিটি’ বা মনোযোগের বিশ্বাসঘাতকতা। অতীতে একে মূলত ‘ফাবিং’ (Phubbing অর্থাৎ Phone এবং Snubbing-এর মিশ্রণ) বলা হলেও, বর্তমান সমাজজীবনে এর মানসিক অভিঘাত এতটাই মারাত্মক রূপ নিয়েছে যে বিশেষজ্ঞরা একে আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বাসের ভঙ্গের সঙ্গে তুলনা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা কেন এত ভয়ংকর? যখন আপনি সঙ্গীর সামনে উপস্থিত থেকেও নিজের সমস্ত মনোযোগ ফোনে সঁপে দেন, তখন সঙ্গীর অবচেতন মনে অবধারিতভাবে একটি নেতিবাচক বার্তা পৌঁছায়। তাঁর কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সঙ্গীর ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে ওই যন্ত্রের ভেতরের ভার্চুয়াল দুনিয়াটি আপনার কাছে ঢের বেশি মূল্যবান। এর ফলস্বরূপ ধীরে ধীরে সম্পর্কে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। সঙ্গী নিজেকে গুরুত্বহীন, চরম একা এবং তীব্রভাবে অবহেলিত মনে করতে শুরু করেন। দিনের পর দিন এমন আচরণ চলতে থাকলে ছোট ছোট জমে থাকা অভিমান একসময় বড় মানসিক দূরত্বের জন্ম দেয়, যা অনেক সময় পরিণতিতে বিচ্ছেদের কারণ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায়।
এই মারাত্মক সমস্যা শুধু রোমান্টিক বা দাম্পত্য সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং বাবা-মা ও সন্তানের সম্পর্ক কিংবা গভীর বন্ধুত্বেও সমানভাবে বিষাক্ত প্রভাব ফেলে। শিশুরা যখন দেখে যে তাদের কোনো কথা শোনার চেয়ে বাবা-মা বা অভিভাবকরা স্ক্রিন নিয়ে ব্যস্ত, তখন তাদের কোমল মনে এক ধরনের গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও হীনম্মন্যতা তৈরি হয়।
এই সম্পর্কের মারণ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? বিশেষজ্ঞরা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কিছু বিশেষ পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রথমত, ঘরে একটি কঠোর ‘নো ফোন জোন’ তৈরি করুন। খাওয়ার টেবিলে, শোবার ঘরে কিংবা দুজনে একান্তে সময় কাটানোর মুহূর্তে ফোন সম্পূর্ণ দূরে রাখুন। দ্বিতীয়ত, কথোপকথনের সময় সঙ্গীর সঙ্গে চোখের যোগাযোগ বা ‘আই কন্টাক্ট’ বজায় রাখুন এবং ফোনটিকে সবসময় উল্টো করে রাখুন যাতে কোনো নোটিফিকেশন বা স্ক্রিন লাইট আপনার মনোযোগ কেড়ে নিতে না পারে। তৃতীয়ত, সঙ্গীকে সবসময় গুরুত্ব অনুভব করান যে তাঁর প্রতিটি কথা আপনার কাছে কতটা মূল্যবান। যদি কোনো কারণে জরুরি কল বা মেসেজ রিসিভ করতেই হয়, তবে আগে সঙ্গীর অনুমতি নিন—”এক মিনিট, এটা খুব জরুরি একটা কল, আমি এক্ষুনি আসছি”।
মনে রাখবেন, সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো নোটিফিকেশনই আপনার ভালোবাসার মানুষের চেয়ে দামি হতে পারে না। তাই আজ থেকেই ফোন স্ক্রিনে সময় কমান এবং সঙ্গীকে একটু বেশি সময় দিন।