মির্জা গালিব স্ট্রিট কাণ্ডের পরই নড়েচড়ে বসল প্রশাসন! কলকাতার ৩,৭০০ হোটেলের মধ্যে লাইসেন্স পেল মাত্র ৪১টি?

মধ্য কলকাতার ব্যস্ত মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি বিলাসবহুল হোটেলে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মর্মান্তিক স্মৃতি এখনও টাটকা। সেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ৯ জনের সকরুণ মৃত্যুর পরই নড়েচড়ে বসেছিল রাজ্য প্রশাসন। এরপরই শহরের সমস্ত হোটেল এবং গেস্ট হাউসগুলির পরিকাঠামো খতিয়ে দেখতে যৌথভাবে ময়দানে নামে দমকল বিভাগ, কলকাতা পুরনিগমের কর্পোরেশন, পুলিশ প্রশাসন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা সিইএসসি (CESC)। এই হাই-ভোল্টেজ যৌথ পরিদর্শনের পর থেকে শহরের হাজার হাজার হোটেলের মধ্যে মাত্র ৪১টি হোটেল ও গেস্ট হাউস তাদের ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের গ্রিন সিগন্যাল বা সবুজ সঙ্কেত পেল।
কলকাতা পুরনিগমের ইস্যু করা দাপ্তরিক লাইসেন্সের হিসাব বলছে, গোটা শহরজুড়ে রেজিস্টার্ড হোটেল ও গেস্ট হাউসের মোট সংখ্যা প্রায় ৩,৭০০টি। কিন্তু মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ঠিক পরেই গঠিত বিশেষ যৌথ কমিটি শহরের ৯৬০টি হোটেল ও গেস্ট হাউস সরেজমিন পরিদর্শন করে। কলকাতা পুরনিগমের প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে এক তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, পরিদর্শনের সময় সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় ওই ৯৬০টি হোটেলের সবকটিরই লাইসেন্স তৎক্ষণাৎ বাতিল করে ব্যবসা বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেয় কমিটি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশিকায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, অগ্নিনির্বাপণ বা আগুন নেভানোর আধুনিক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরিকাঠামো সঠিকভাবে গড়ে তোলার পর পুনরায় আবেদন করলে যৌথ কমিটি ফের সরেজমিন পরিদর্শন করে সবুজ সঙ্কেত দেবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মাত্র ৪১টি হোটেল ও গেস্ট হাউস সেই শর্ত পূরণ করে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করতে পেরেছে। ফলে কেবল এই নির্দিষ্ট ৪১টি হোটেলের ক্ষেত্রেই আগামী দিনে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা থাকছে না। অন্যদিকে, বাকি ৯১৯টি হোটেল ও গেস্ট হাউস এখনও পর্যন্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করে উঠতে পারেনি। ফলস্বরূপ, সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে আপাতত ওই হোটেলগুলির দরজা বন্ধই থাকছে।
উল্লেখ্য, মির্জা গালিব স্ট্রিটের ওই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরই মূলত প্রশাসনিক নজরদারির বিরাট গাফিলতি জনসমক্ষে চলে এসেছিল। তদন্তে উঠে আসে যে, যে বাড়িটিতে ভয়াবহ আগুন লেগেছিল, সেখানে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ৪০টি আলাদা আলাদা লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছিল। অথচ ওই একটিমাত্র বাড়িতে এতগুলি সমান্তরাল ব্যবসা চালানোর মতো ন্যূনতম পরিকাঠামো বা অগ্নিপ্রতিরোধক ব্যবস্থা আদৌ আছে কি না, তা একবারের জন্যও খতিয়ে দেখেনি পুরনিগম। এই চরম অব্যবস্থার পরই বিভিন্ন দফতরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায় কমিটি গঠন করা হয়, যারা লাগাতার পরিদর্শন চালিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ শুরু করে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত সামান্য গাফিলতি ধরা পড়লেই যেখানে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেখানেই এই চাঞ্চল্যকর ফলাফল সামনে এল।
এদিকে, হোটেলগুলিতে পরপর এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকেই পুরনিগম লাইসেন্স ইস্যু করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়মনীতিতে আমূল পরিবর্তনের কথা தீவிரভাবে বিবেচনা করছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বাম জমানায় কড়া নিয়ম ছিল যে, কেউ নতুন লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলে বা পুরনো লাইসেন্স পুনর্নবীকরণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ডে ইন্সপেক্টর বা পরিদর্শক যাবেন। তিনি আবেদনকারীর জমা দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি সরেজমিনে মিলিয়ে দেখবেন। ব্যবসা পরিচালনার উপযুক্ত পরিকাঠামো আছে কি না তা যাচাই করার পরই লাইসেন্স মিলত। পরবর্তী সময়ে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পরিবর্তনের বাংলায় লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে আবার সেই বাম আমলের কড়া নিয়মগুলিই ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জোরদার চর্চা শুরু হয়েছে।