মা চুরুলিয়ায়, বাবা ঢাকায়! কাজী নজরুল ইসলামের শেষ বিদায় ঘিরে কোন অজানা আক্ষেপ?

পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকার মাটিতে কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের ঠিক পরদিন কলকাতার রবীন্দ্র সদনে কবির স্মরণে যে শোকসভার আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে দমদম বিমানবন্দর থেকে উদভ্রান্ত ও বিপর্যন্ত অবস্থায় এসে পৌঁছান নজরুলের জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী ও ছোট পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী। তারা দুজনেই তখন সরাসরি ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। শোকসভায় বিষণ্ণমুখে কাজী সব্যসাচী বারবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “মা রইলেন চুরুলিয়ায় আর বাবা রইলেন ঢাকায়। এ আক্ষেপ সারাজীবন থাকবে।”

কবির পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য তখন কলকাতায় বা আসানসোলের কাছাকাছি বসবাস করতেন এবং তাদের প্রবল ইচ্ছা ছিল চুরুলিয়ার জন্মভিটেয় স্ত্রী প্রমীলা দেবীর কবরের পাশেই কবিকে সমাহিত করা হোক। ১৯৭৬ সালের ২৯শে অগাস্ট কাজী সব্যসাচী ও কল্যাণী কাজী যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছান, তার বহু আগেই কবির দাফন সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। অথচ ১৯৬২ সালে প্রমীলা দেবীর মৃত্যুর আগেও তিনি বারবার অনুরোধ করে গিয়েছিলেন তাকে যেন চুরুলিয়াতেই গোর দেওয়া হয়, কারণ কবিও তো জীবনের শেষে সেখানেই ফিরে যাবেন।

ঘটনার শুরু ১৯৭২ সালের ২৪শে মে, যখন নিজের জন্মদিনে কবি নজরুল ইসলাম কলকাতা থেকে ঢাকায় পাড়ি দিয়েছিলেন। তৎকালীন সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশেষ উদ্যোগে নজরুলকে সাময়িকভাবে ঢাকায় পাঠানোর সেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দুদেশের যৌথ ভাবনায় ঠিক হয়েছিল এক বছর কবি ঢাকায় এবং পরের বছর কলকাতায় থাকবেন। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ সরকার—কাউরেই কল্পনাতে ছিল না যে এই যাত্রা চিরতরে শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়াবে এবং মৃত্যুর পর তাকে ঢাকায় সমাহিত করার সিদ্ধান্ত একাই নেবে বাংলাদেশ সরকার।

বর্ষীয়ান নজরুল গবেষক বাঁধন সেনগুপ্ত বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেদিনকার মর্মান্তিক ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, কলকাতায় আকাশবাণী কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ বেতারে কবির মৃত্যুসংবাদ শুনে সব্যসাচী প্রথমে কলকাতা উপ-রাষ্ট্রদূত অফিসে যান। কিন্তু সেখানেও তখনো কোনো সুনির্দিষ্ট খবর ছিল না। এদিকে সব্যসাচীর পাসপোর্টটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তবুও বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপে সব্যসাচী ও কল্যাণী কাজী দুপুরের বিমান ধরে ঢাকায় পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যাওয়ায় কবির পরিবার গভীর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে, যা আজও ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মহলে একটি বিতর্কিত ও বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে রয়েছে।